সর্বশেষ আপডেট ১৪ ঘন্টা ২১ মিনিট আগে
আপনি আছেন হোম / মতামত / কলাম / অসমের বাঙ্গালি বন্দি শিবিরগুলো এবং অসমের অর্থনীতি

অসমের বাঙ্গালি বন্দি শিবিরগুলো এবং অসমের অর্থনীতি

প্রকাশিত: ০৫ জানুয়ারি ২০১৮ ১২:২০ টা | আপডেট: ০৫ জানুয়ারি ২০১৮ ১২:৩২ টা

আলতাফ পারভেজঃ

দুই.
অনেকেই মনে করছেন বর্মায় রোহিঙ্গাদের সর্বশেষ গণহত্যা ও বিতাড়ন উদ্যোগের সফলতা দেখে ভারত নিয়ন্ত্রিত অসমে বিজেপি অনুরূপ উদ্যোগ শুরু করেছে। এটা এই অর্থে ভুল ধারণা যে, অসমে এই উদ্যোগটি অনেক পুরানো।

অসমে বাংলাভাষীদের গণহত্যা ও বিবিধ নিপীড়নের অনেক ইতিহাস রয়েছে। বহুরূপে নিয়মিতই এসব ঘটছে। কিন্তু বাংলাদেশের সীমান্ত দেশে এসব ঘটলেও বাংলাদেশের বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদী এগুলো সম্পর্কে শুনতে-বুঝতে চায়নি অতীতে। চূড়ান্ত গণহত্যা শুরুর আগে রোহিঙ্গাদের অতীত নিপীড়িত অধ্যায় সম্পর্কে আমরা যেমন জানতে চাইতাম না-- অসমের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে।

সর্ব-সাম্প্রতিক নাগরিক তালিকার আগে থেকেই অসমের বাংলাভাষীরা কীরূপ ধর-পাকড়-নিপীড়নের মধ্যে আছে তার একটা বড় উদাহরণ সেখানকার ‘ডিটেনশন সেন্টার’গুলো। বর্তমানে অসমের অন্তত ছয়টি স্থানে (গোয়ালপাড়া, কোকড়াঝাড়, শিলচর, দিব্রুগড়, জোড়হাট, তেজপুর) কারাগারের মতো করে তৈরি এইরূপ ডিটেনশন সেন্টারগুলোতে বাংলাভাষীদের বন্দি করে রাখা হয়েছে সন্দেহজনক মানুষ তথা ‘ডি-ভোটার’ (ডাউটফুল ভোটার) এবং ‘বিদেশী’ তকমা দিয়ে। গোয়ালপাড়াতে ২০ বিঘা জমির উপর নির্মিত হচ্ছে সমগ্র ভারতের সবচেয়ে বড় ডিটেনশন সেন্টার (এবং অবশ্যই এটা অসমের একটা মুসলিম প্রধান জেলা!)

ছবিতেই দেখতে পাচ্ছেন আলোচ্য ডিটেনশন সেন্টারগুলোর বন্দিদের মধ্যে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও আছেন এবং এরা অসমের সবচেয়ে দরিদ্র মানুষদের অংশ। বর্তমানে প্রায় দুই হাজার মানুষ আছে এসব সেন্টারে। তবে প্রতিনিয়তই এসব ডিটেনশন সেন্টারের বন্দি সংখ্যা বাড়ছে এবং বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর তা আরও বেগবান হয়েছে। যাদের কাছেই নাগরিকত্বের ‘সন্তোষজনক’ কাগজপত্র পাওয়া যায় না-- এমন বাংলাভাষীদেরই এইরূপ ডিটেনশন সেন্টারে পুরে দেয়া হচ্ছে। অসমের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এরকম প্রায় এক লাখ ‘অবৈধ মানুষ’-এর তালিকা নিয়ে নিয়মিতই অনুসন্ধান ও গ্রেফতার কার্যক্রম চালায়।

https://scontent-sit4-1.xx.fbcdn.net/v/t1.0-9/26165587_10215153265096030_7173945319265496878_n.jpg?oh=29d7d5cb5be2ee211f21de2418fc6f76&oe=5AF3C160ছবিটি দেখুন। এই তরুণের নাম মঈনাল মোল্লা। অসমের বরপেটা জেলার বাসিন্দা। ২০১৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তাকে নিজ বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে ডিটেনশন সেন্টারে পুরে রাখা হয়েছিল। প্রায় তিন বছর পর আইনযুদ্ধের মাধ্যমে তিনি মুক্তি পান। বলা হচ্ছে মোল্লা অসমে নাগরিক নয় (সুতরাং বাংলাদেশী!!!)। অথচ মঈনাল মোল্লাদের পরিবারের ১৯৩৮ সালে করা জমি রেজিস্ট্রেশনের প্রমাণও রয়েছে। তার দাদার নামও রয়েছে সেখানকার ১৯৬৬ সালের ভোটার লিস্টে। মুশকিলের দিক হলো ভারত জুড়ে আর খুব কম প্রদেশেই মানুষকে নাগরিকত্ব প্রমাণের এই বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে-- যেমনটি করতে হচ্ছে অসমের বাংলাভাষীদের।

২০০৪ থেকে সেখানে এই কার্যক্রম চলছে--যদিও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার মানবাধিকার আন্দোলনে অসমের বাংলাভাষীদের এই বঞ্চনাদগ্ধ অধ্যায় কোন বড় এজেন্ডা হয়ে ওঠেনি। বরং প্রতিনিয়ত ভারতীয় প্রধান প্রধান প্রচারমাধ্যমে এই ‘অবৈধ বাংলাভাষী’দের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো ছাড়াও এইমর্মেও মন্তব্য জুড়ে দেয়া হয়-- এরা বাংলাদেশ থেকে যাওয়া মানুষ।

ভারতের প্রদেশগুলোর মধ্যে অসম প্রধানতম এক দারিদ্র্য কবলিত অঞ্চল। এখানে জনসংখ্যার ৩২ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নীচে অবস্থান করে। এটা বিশ্বব্যাংকের হিসাব। অন্যদিকে একই সংস্থার হিসাবে বাংলাদেশে হতদরিদ্রদের হার এখন ১৩ শতাংশের মতো এবং সাধারণ দারিদ্র্যের হার ২০ শতাংশের নীচে।

আমি এখানে এই মর্মে দুটি গ্রাফ তুলে ধরছি যাতে সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান সম্পন্ন মানুষমাত্রই বুঝতে পারবেন যে, বাংলাদেশ থেকে অর্থনৈতিকভাবে উন্নত জীবন-যাপনের জন্য অসমে যাওয়ার ধারণাটি কত অযৌক্তিক।

দারিদ্র্য পরিস্থিতিতে অসমের অবস্থা ভারতীয় গড়ের চেয়েও খারাপ (হলুদ চিহ্ন) (ভারতীয় গড় দেখুন দশম কলামে)

প্রথম গ্রাফটিতে দেখুন, দারিদ্র্য পরিস্থিতিতে অসমের অবস্থা কী এবং কীভাবে তা ভারতীয় গড়ের চেয়েও খারাপ। দ্বিতীয় গ্রাফটিতে দেখুন অসমের দারিদ্র্য পরিস্থিতিতে (লাল রঙ দারিদ্র্যের মাত্রা নির্দেশ করছে) সবচেয়ে খারাপ জেলাগুলোই মুসলমান প্রধান (যেমন, ধুবরি, নওগাঁ ইত্যাদি।) আবার মাথাপিছু আয়ে অসমের নাগরিকদের অবস্থান বাংলাদেশের অর্ধেকের চেয়েও খারাপ।

লাল রঙ দারিদ্র্যের মাত্রা নির্দেশ করছে

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে দারিদ্র্য পীড়িত উপরোক্ত জনপদে বাংলাদেশের মানুষ কেন যাবে? কিন্তু এইরূপ যৌক্তিক প্রশ্নের ধার না ধেরেই এখানকার শাসক এলিট সফলতার সঙ্গে একটি কাজ করে চলেছেন--তাহলো বাংলাভাষী দরিদ্র মানুষ পেলেই তাকে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ‘বিদেশী’ অভিহিত করা, তার নাগরিক অধিকার অস্বীকার করা এবং তাকে ডিটেনশন সেন্টারে পাঠিয়ে দেয়া।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে এবং যুদ্ধকালে নাজিরা অনেক কনসেনট্রেশন ক্যাম্প গড়ে তুলেছিল। প্রথম দিকে রাজনৈতিক ভিন্নমতালম্বীদের এবং পরে ধীরে ধীরে ‘অগ্রহণযোগ্য নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীগুলো’কে এগুলোয় রাখা হতো। ১৯৪৫ নাগাদ এসব ক্যাম্পে বন্দি মানুষের সংখ্যা সাত লাখ অতিক্রম করেছিল। কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের বাইরে নাজিরা গড়ে তুলেছিল ‘এক্সট্রামিনেশন ক্যাম্প’। কনসেনট্রেশন ক্যাম্পকে যদি বন্দিশিবির বলি, ‘এক্সট্রামিনেশন ক্যাম্প’কে বলতে হবে নির্মূল শিবির।

আসামের বর্তমান ‘বাংলাদেশী বন্দিশিবিরগুলো’ কী ৭০ বছর আগের নাজি শিবিরগুলোর সঙ্গে তুলনীয়? জানি সিরিয়াস ভিন্নমত থাকবে অনেকের। তবে স্পষ্টত খানিকটা নাজি মাইন্ডসেটের ছাপ আছে এতে। [চলবে...|

প্রথম পর্ব: অসম সীমান্তে কী হচ্ছে?

বানান রীতি লেখকের নিজস্ব, অনলাইন বাংলার রীতি অনুযায়ী অসম মানে আসাম

পাঠক মন্তব্য () টি

নেপালে ক্ষমতা নিয়ে নতুন খেলা?

নির্বাচনে পরাজিত হবার পরও নেপালি কংগ্রেসের নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবা…

তুর্কি-সুদান সহযোগিতা ও ইরিত্রিয়ায় মিসরের সেনা প্রেরণ

সুদান-তুরস্ক সম্পর্ক ও ইরিত্রিয়ায় মিসরের সেনা পাঠানোর বিষয়ে মাসুমুর রহমান খলিলীর পর্যালোচনা।

২০১৮ সাল: ইসলামিস্টদের সকাল আসন্ন!

ইসলামী আন্দোলন বা রাজনৈতিক ইসলাম শক্তিশালী খেলোয়াড় হিসাবে ফিরে আসছে।

কপিরাইট ২০১৪ onlineBangla.com.bd
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: গুলবুদ্দিন গালীব ইহসান
অনলাইন বাংলা, ৬৯/জি গ্রিন রোড, পান্থপথ (নীচ তলা), ঢাকা-১২০৫।
ফোন: ৯৬৪১১৯৫, মোবাইল: ০১৯১৩৭৮৯৮৯৯
ইমেইল: contact.onlinebangla@gmail.com
Developed By: Uranus BD