সর্বশেষ আপডেট ১৪ ঘন্টা ১৮ মিনিট আগে
আপনি আছেন হোম / মতামত / কলাম / জেরুসালেমের জন্য তৃতীয় ইনতিফাদা

জেরুসালেমের জন্য তৃতীয় ইনতিফাদা

প্রকাশিত: ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭ ২২:২৩ টা

নাগেহান আলকীঃ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন দূতাবাস জেরুসালেমে স্থানান্তর এবং এটাকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসাবে ঘোষণা করার সিদ্ধান্তটি মানব মূল্যবোধের প্রতি এক প্রকাশ্য বিশ্বাসঘাতকতা। ট্রাম্পের নিজের ক্ষমতা সংহত করা ছাড়া এর পেছনে আর অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমেরিকান সিস্টেম এবং তার নিজ রিপাবলিকান দলের মধ্যে সমর্থন লাভে ব্যর্থ হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইহুদিবাদি লবি এবং ইভানজেলিক্যালদের সমর্থন পাওয়ার মাধ্যমে তার প্রেসিডেন্ট অফিসকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করছেন।

এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ট্রাম্প মূলত আগামী নির্বাচনে সফল হওয়ার পরিবর্তে তার বর্তমান মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিজের পদ রক্ষা করতে চাইছেন বলে মনে হয়। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ স্পষ্টতই সৃষ্ট পরিস্থিতির দ্বারা বিরক্ত। ইভানজেলিক্যালদের মধ্যে রয়েছে ট্রাম্পের সমর্থনের ভিত্তি। অন্যদিকে ইহুদি-আমেরিকানরা সাধারণত ডেমোক্রেটিক দলকে সমর্থন করে আর ট্রাম্পের অবস্থান নিয়ে তারা সন্তুষ্ট নন। ট্রাম্পের এই ধরনের সিদ্ধান্ত তাদের রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রভাবিত করবে বলে মনে হয় না। এছাড়াও, দেশটির মধ্যপশ্চিমে রিপাবলিকান ঘাঁটিতে সাধারণভাবে ইহুদীদের প্রতি ভোটারদের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নেই। ফলে ট্রাম্পের সর্বশেষ পদক্ষেপটি তাকে নির্বাচনে কিছু ক্ষতিও করতে পারে।

দুর্ভাগ্যবশত, ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে আসন্ন বিশৃঙ্খলার লক্ষণ হিসাবে সহিংসতা শুরু হয়ে গেছে। মুসলিমরা ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে আপত্তি করেছে, কিন্তু মুসলিম বিশ্বের প্রধান সমস্যা হলো উম্মাহর মধ্যে সমান্তরাল কর্তৃত্বের অভাব। মুসলিম দেশগুলোর বেশির ভাগই দুর্বল এবং দৃঢচেতার অভাব রয়েছে তাদের মধ্যে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব অতিক্রম করে নিজ জাতির প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। এ কারণে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়িপ এরদোগানের নেতৃত্ব এবং তুরস্কের ভয়েস মুসলিম উম্মাহর প্রতিবাদকে তীব্র এবং ন্যায়বিচারের একটি ভিত্তি স্থাপন করার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ট্রাম্পের উত্তেজক সিদ্ধান্ত সম্ভবত একটি তৃতীয় ইনতিফাদার সৃষ্টি করতে যাচ্ছে । হামাস ইতিমধ্যে এই ব্যাপারে একটি বিবৃতি দিয়েছে। প্রথম ইনতিফাদা ১৯৮৭ সাল থেকে ১৯৯৩ সালের মধ্যে সংঘটিত হয় এবং অসলো চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে এর সমাপ্তি ঘটে। তারপর দ্বিতীয় ইনতিফাদা ঘটে ২০০০ সাল থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে।

প্রকৃতপক্ষে, ইসরাইল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বের অন্তর্নিহিত কারণের প্রধান দিকগুলি না জানা থাকলে ইনতিফাদার সম্পূর্ণ মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলির সংক্ষিপ্ত কালক্রমকে সামনে রাখা হলে এটি উপলব্ধি করা যাবে।

ফিলিস্তিন আক্রমণের প্রথম দশকে ফিলিস্তিনীরা আশা করেছিল যে, আরব রাষ্ট্রগুলো তাদের জন্য দাঁড়াবে এবং ফিলিস্তিনকে রক্ষা করবে। এই সময়কে ইহুদিবাদী-ফিলিস্তিনি দ্বন্দ্ব থেকে আরব-ইসরেইলি যুদ্ধের এক বিবর্তন হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে। তবে, সময়ের বিবর্তনে এটি প্রমাণিত হয় যে, আরব বিশ্ব, বিশেষ করে মিশরীয় প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের ইসরাইলের সাথে সামরিক সংঘাতে জড়াতে অনিচ্ছুক ছিলেন।
এছাড়া জর্দান ব্যতিত অন্য আরব দেশ ফিলিস্তিনের শরণার্থী শিবিরগুলোকে সহায়তা করেনি এবং দরিদ্র অবস্থার কথা বলে তাদের দেশ থেকে ফিলিস্তিনিদের বহিষ্কার করা হয়। এই পর্যায়ে আবির্ভূত হয় ফিলিস্তিনি জাতীয় স্যালভেশন ফ্রন্ট। মিশরীয় প্রশাসন এবং কুয়েত শাসিত গাজা ক্যাম্প থেকে প্রথম আন্দোলনটির সুত্রপাত হয়।

১৯৫৭ সালে ইয়াসির আরাফাত, খলিল আল-ওয়াজির ও সালাহ খালাফের উদ্যোগে কুয়েতে আল ফাতাহ প্রতিষ্ঠিত হয়। তারা প্রতিরোধের প্রতি মনোযোগ দেয় এবং ইসরাইল এর জোরালোভাবে বিরোধিতা করে আন্দোলনের সমর্থকদের হত্যা শুরু করে।

১৯৬৪ সালে নাসের পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা (পিএলও) প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরাইল নতুন আরব এলাকা দখল করে এবং ৬ লাখ ৬৫ হাজার ফিলিস্তিনিকে নির্বাসিত করে। এর পর পিএলও স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এই চরম পদক্ষেপ উদ্দেশ্যে পরিবর্তন নিয়ে আসে। তারপর ইসরায়েলকে উৎখাত করে সেখানে মুসলিম, ইহুদী ও খ্রিস্টানরা শান্তিপূর্বক সহাবস্থান করতে পারে এমন একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ধারণা গৃহীত হয়। এদিকে, জর্দান গেরিলা যুদ্ধের সদর কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

১৯৭০ সালে, পিএলও পূর্ব জেরুসালেমে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ঘোষণা দেয় এবং ইসরাইলি বিমান ছিনতাই করে জর্ডান বিমানবন্দরে অবতরণে বাধ্য করে। আর এইভাবে, জর্দান প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে এবং নানা অভিযোগের সম্মুখীন হয়। বাদশাহ হুসেনকে হত্যা চেষ্টা করার পর জর্দানে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে এবং জর্ডানের সেনাবাহিনীর আক্রমণে মুখোমুখি হয় ফিলিস্তিনিরা। পরবর্তীতে, পিএলও সদর দফতর লেবাননে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ফিলিস্তিনি সব উপদল একক কমান্ড ইউনিটের অধীনে সমবেত হয়।

অস্ত্র সংগ্রহের মাধ্যমে সামরিকীকরণের প্রক্রিয়াটি এগিয়ে যায়। এছাড়াও, এর কার্যক্রম পাশ্চাত্যে বিস্তৃত করার প্রচেষ্টা নেয়া হয়। তারপর মিউনিখ আক্রমণের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে মিউনিখের অলিম্পিকের সময় ইসরাইলি অলিম্পিক দলের সদস্যদেরকে পণবন্দী করে হত্যা করা হয়। এই সবের মধ্যে ১৯৭৫ সালে লেবাননে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় যা পিএলওকে এগিয়ে যাবার সুযোগ এনে দেয়। ১৯৭৬ সালে সিরিয়া লেবাননে প্রবেশ করে, ১৯৭৮ সালের মার্চে এবং ১৯৮২ সালের জুনে ইসরাইল দেশটি আক্রমণ করে। ১৯৮২ সালে লেবাননে আক্রমণ করার উদ্দেশ্য ছিল লেবানন থেকে ফিলিস্তিনিদের বের করে দেওয়া।

এই ঘটনাটি ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটায়। শাতিলা ক্যাম্পে গণহত্যা ১৯৮৭ সালে প্রথম ইন্তিফাদার ভিত্তি তৈরি করে এবং আন্তর্জাতিক স্তরে ফিলিস্তিন আন্দোলন ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে অবদান রাখে। এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ জেরুসালেম ঘোষণার সাথে সাথে ক্রোধ আরও বেড়ে যাচ্ছে। এই গণ সংগ্রামে অনেক জীবন কোরবান হতে পারে, তবে ফিলিস্তিনীদের অন্যায্য ভোগান্তির প্রতিবাদ এবং ন্যায়সঙ্গত বিদ্রোহ এর মাধ্যমে একটি নতুন পর্যায়ে পৌঁছতে পারে।

দৈনিক সাবাহ থেকে অনুবাদ মাসুমুর রহমান খলিলী

পাঠক মন্তব্য () টি

নেপালে ক্ষমতা নিয়ে নতুন খেলা?

নির্বাচনে পরাজিত হবার পরও নেপালি কংগ্রেসের নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবা…

তুর্কি-সুদান সহযোগিতা ও ইরিত্রিয়ায় মিসরের সেনা প্রেরণ

সুদান-তুরস্ক সম্পর্ক ও ইরিত্রিয়ায় মিসরের সেনা পাঠানোর বিষয়ে মাসুমুর রহমান খলিলীর পর্যালোচনা।

অসমের বাঙ্গালি বন্দি শিবিরগুলো এবং অসমের অর্থনীতি

আসাম পরিস্থিতি নিয়ে গবেষক আলতাফ পারভেজের পর্যালোচনার দ্বিতীয় পর্ব।

কপিরাইট ২০১৪ onlineBangla.com.bd
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: গুলবুদ্দিন গালীব ইহসান
অনলাইন বাংলা, ৬৯/জি গ্রিন রোড, পান্থপথ (নীচ তলা), ঢাকা-১২০৫।
ফোন: ৯৬৪১১৯৫, মোবাইল: ০১৯১৩৭৮৯৮৯৯
ইমেইল: contact.onlinebangla@gmail.com
Developed By: Uranus BD