সর্বশেষ আপডেট ৭ ঘন্টা ৫৯ মিনিট আগে
আপনি আছেন হোম / মতামত / কলাম / রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কতদূর?

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কতদূর?

প্রকাশিত: ২৫ নভেম্বর ২০১৭ ১৬:৫৬ টা | আপডেট: ২৫ নভেম্বর ২০১৭ ১৭:১৬ টা

মাসুমুর রহমান খলিলীঃ

রোহিঙ্গাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিয়ে বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ উন্নয়নের খবর প্রকাশ হচ্ছে গণমাধ্যমে। গত বুধবার বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী নেপাইডোতে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর ও পররাস্ট্র মন্ত্রী অং সান সু চির সাথে এক বৈঠকের পর দু’দেশের মধ্যে এক সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। এই চুক্তির বিস্তারিত কোন বিররণ বাংলাদেশ কিংবা মিয়ানমারের পত্র পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়নি। শুধু বলা হয়েছে, ১৯৯৩ সালের সমঝোতা অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের সে দেশে ফিরিয়ে নেয়া হবে। দু’মাসের মধ্যে এই প্রক্রিয়া শুরু হবে। আর এই প্রক্রিয়া সচল রাখা ও তত্বাবধান করতে দু’দেশের মধ্যে একটি ওয়ার্কিং কমিটি গঠনের কথাও বলা হয়েছে। এই প্রক্রিয়াটি শুরু হবার আগে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করে গেছেন। আর এর দুদিন পর মিয়ানমারের সেনা প্রধান বেইজিংয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন । এ সময় শি বলেছেন, মিয়ানমারের শান্তি প্রক্রিয়ায় চীন গঠনমূলক ভুমিকা পালন করবে। দুদেশের সেনা বাহিনীর মধ্যে পারষ্পরিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা হবে।

এর আগে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ভারতের কাছে এই সঙ্কট নিরসনে সহায়তা চেয়েছিলেন। কিন্তু দিল্লি থেকে এ ব্যাপারে ইতিবাচক সাড়া মিলেনি বলে ঢাকার পররাষ্ট্র দফতরের সুত্র উল্লেখ করেছে। বাংলাদেশে এক সময় দায়িত্বপালনকারী ভারতীয় হাইকমিমনার পিনাক রঞ্জন এক ধাপ এগিয়ে এ সমস্যার সমাধান করার জন্য চীনের কাছে যাবার পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকাকে। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের জন্য জাতিসংঘে উত্তাপিত এক প্রস্তাবে ভারত ভুটান নেপাল শ্রীলঙ্কা এই চার সার্ক দেশের সমর্থন লাভে ব্যর্থ হয়েছে ঢাকা। বরং প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দিয়ে তা পাস করতে সহযোগিতা করেছে তুরস্ক পাকিস্তান সৌদি আরবসহ ওআইসি ও যুক্তরাষ্ট্র আর ইইউভুক্ত দেশগুলো্। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ এক প্রকার নিশ্চিত হয়েছে যে বৃহৎ প্রতিবেশি ভারত রোহিঙ্গা ইস্যু নিষ্পত্তির ব্যাপারে কোন কার্যকর সাহায্য করতে পারবে না। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় দেশগুলো এই ইস্যুতে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারলেও এর সমাধান তথা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে কোন সাহায্য করতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না।

এই বাস্তবতার কারণে ঢাকার সামনে সঙ্কটের সমাধানের জন্য একটি মাত্র উপায় অবশিষ্ট রয়েছে সেটি হলো চীনের সহায়তা নেয়া। রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন তার কৌশলগত বন্ধু দেশ মিয়ানমারকে শুরু থেকেই সমর্থন করে গেছে। জাতি সংঘের এ সংক্রান্ত প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দিলেও বেইজিং এই সমস্যার সমাধানের ব্যাপারে অবশ্য বরাবরই বাংলাদেশের সাথে যোগাযোগ রেখেছে। এই সমস্যার সমাধানের ব্যাপারে মিয়ানমার কেবলমাত্র চীনের কথা শোনতে পারে বলে মনে হচ্ছে। যদিও জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক ফোরামে মিয়ানমারের সেনা বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ বেশ চাপে ফেলেছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে। এক সময়ের পাশ্চাত্যর বিশেষ আস্থাভাজন নেত্রী অং সান সু চি এখন মিয়ানমারের ক্ষমতায় থাকলেও দেশটির নীতি নির্ধারণ ও সরকার পরিচালনায় তার একক কোন কর্তৃত্ব নেই। বরং নিরাপত্তা সংক্রান্ত ইস্যুতে সেনা বাহিনীর ইচ্ছার বাইরে যাওয়া তার পক্ষে অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছে। সু চির দল এনএলডির মধ্যে সেনা হস্তক্ষেপের একটি ভয়ও সব সময় কাজ করে।

রোহিঙ্গা সঙ্কট এই অঞ্চলের জন্য কয়েক শতক ধরে চলে আসা একটি ইস্যু। কয়েক শতক ধরে বিরাজ করা স্বাধীন আরাকান রাজ্যে রোহিঙ্গা এবং রাখাইনরা ছিল প্রধান জনগোষ্ঠি। তারা সম্মিলিতভাবেই এক সময় রাজ্যে বর্মী আক্রমণ ঠেকিয়ে স্বাধীনতা রক্ষার জন্য কাজ করেছে। কিন্তু সেই চিত্র এখন আর নেই। এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্ম বিশ্বাসের ব্যবধানকে কাজে লাগাতে রাখাইন সম্প্রদায়ের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে দেশটির সামরিক শাসকরা। ফলে ১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীন হওয়ার পর থেকে রোহিঙ্গারা ক্রমেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠিতে পরিণত হয়। দেশটির স্বাধীনতার পরও যেখানে রোহিঙ্গা মন্ত্রী এবং সংসদ সদস্য ছিল সেখানে ১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইন করে তাদের রাষ্ট্রহীন করা হয়। ২০১৪ সালের আদম সুমারি থেকে তাদের হিসাব বাদ দেয়া হয়। বার্মার স্বাধীনতা লাভের পর একদিকে রোহিঙ্গাদের নাগরিক চলাচলের অধিকার অস্বীকার করে তাদের উপর সামাজিক সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক দুরাবস্থা চাপিয়ে দেয়া হয়। অন্য দিকে তাদের একটি অংশকে স্বাধীনতার দাবি জানানোর জন্য উসকে দেয়া হয়। এভাবে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানকে অনেকটাই দুরে ঠেলে দেয়া হয়।

এখন বলা হচ্ছে রোহিঙ্গাদের বৈধ কাগজপত্র দেখে তাদের ফিরিয়ে নেয়া হবে। প্রথমত, তাদের কাছ থেকে একাধিক দফায় পুরণো কাগজ পত্র নিয়ে নতুন কাগজ দেয়া হয়। ফলে রোহিঙ্গাদের কাছে পুরণো কোন কাগজ থাকার কথা নয়। আর নতুন যে কাগজ দেয়া হয় বাড়ি ঘরে অগ্নি সংযোগ আর লুটপাটের কারণে সে কাগজ তাদের সাথে থাকার কথা নয়। এছাড়া ১৯৯২ সালে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া আর এবার ঠেলে দেয়ার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। এখন বৈধ কাগজ দেখে ফিরিয়ে নেবার কথা বলা হলে খুব অল্প সংখ্যকই সেখানে ফেরত যেতে পারবে।

বিবিসির তথ্য অনুসারে এক সময় মিয়ানমারে রোহিঙ্গার সংখ্যা ছিল ২৩ লাখ। সর্বশেষ বিতাড়নের আগে সেখানে এই সংখ্যা ১১ লাখের কাছাকাছি চলে আসে। সেখান থেকে সাড়ে ৬ লাখ বিতাড়নের পর বাকি যারা আছে তাদের অবস্থান মূলত সেখানকার বিভিন্ন আশ্রয়স্থলে। উত্তর দক্ষিণ ও মধ্য রাখাইনে যে রোহিঙ্গা বসতি ছিল সেখান থেকে বিতাড়িত হয়েছে প্রায় সবাই। শুধু বিতাড়িত হয়েছে তাই নয় তাদের বাড়ি ঘরে আগুণ দিয়ে বসতিকে অস্তিত্বহীন করা হয়েছে। এখন রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবার পর আবার পুরণো গ্রামে তারা বসবাস করবে এমন কোন সুযোগ কার্যত নেই।

মিয়ানমারের বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে রোহিঙ্গাদের আগের অবস্থায় আর ফিরিয়ে নেয়া হবে না। তাদের একটি অংশকে সেখানে পূনর্বাসন করা হবে সরকারের পরিকল্পনা অনুসারে। হয়তো তাদের বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে বা পূনর্বাসন কেন্দ্রে অনেকটা নজরদারি বা অন্তরীন অবস্থায় রাখা হবে। অথবা তাদের বিভিন্ন টাউনশিপে এমনভাবে রাখা হবে যেখানে তারা কোনভাবেই ৪০ শতাংশের বেশি হবে না।

রাখাইনে যেসব অঞ্চল দিয়ে চীন-মিয়ানমার গ্যাস ও তেল পাইপ লাইন যাচ্ছে তার আশেপাশে এবং চীনের বিশেষ অর্থনৈতিক জোন অঞ্চলের আশ পাশে তাদের কোন বসতি রাখা হবে না।

রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের ব্যাপারে গঠনমূলক ও টেকসই উদ্যোগ বাংলাদেশ বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কোন সময় নেয়নি। বরং তাদের বিরুদ্ধে মিয়নমারের ভেতর জাতীতাবাদী প্রচারণা এমনভাবে চালানো হয়েছে যে সেখানে তাদের নিয়ে বৌদ্ধ নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক ঘৃণা সৃষ্টি করা হয়েছে। মা বা থা নামের একটি উগ্র বৌদ্ধ গোষ্ঠি এ ব্যাপারে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। অন্তরালে তাদের ব্যবহার করেছে সামরিক বাহিনীর একটি পক্ষ।

মিয়ানমারের কাঠামোর মধ্যে রোহিঙ্গাদের সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে কফি আনান কমিশন ভালো কিছু প্রস্তাব করেছে। কিন্তু সে প্রস্তাব বাস্তবাযন হলে সব রোহিঙ্গা নিজ দেশে ফিরতে পারবে বা নাগরিক অধিকার পাবে এমন কোন সুপারিশ সেখানে নেই। এ্টাকে রোহিঙ্গাদের সমস্যা সমাধানে এক ধাপ অগ্রগতি শুধু বলা যাবে।

রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের বিষয়টি শুধু যে মানবিক এমন নয় একই সাথে এটি কৌশলগত একটি বিষয়ও। এই কারণে এই অঞ্চলের দেশগুলোকে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে তাদের স্বার্থেই। এই অঞ্চলে চীনের ব্যাপক অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। বেইজিং মনে করে আরসার হামলার মাধ্যমে এখানে অস্থিরতা তৈরি করে চীনা স্বার্থ ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে। চীনের এই পর্যবেক্ষণ একবারেই হয়তো ভিত্তিহীন নয়। তবে একটি জাতিগোষ্ঠিকে অধিকার হরণ করে জাতিগত নিশ্চিহ্নকরণ এই সমস্যার সমাধান হতে পারে না। এ জন্য চীনকে রোহিঙ্গাদের কার্যকর পুনর্বাসনের ব্যবস্থার কথা ভাবতে হবে যার মধ্যে অবশ্যই রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকারের স্বীকৃতি এবং বিতাড়িতদের প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে হবে।

অন্যদিকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ব্যাপারে বাংলাদেশ এবং দুই আশিয়ান মুসলিম সদস্য মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া বিশেষ উদ্যোগ নিতে পারে। এই সমস্যার সমাধানের কার্যকর কোন ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত চীন না চাইলেও আন্তর্জাতিক চাপ অবশ্যই বজায় রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে হবে।

মাসুমুর রহমান খলিলী: উপসম্পাদক, দৈনিক নয়াদিগন্ত

পাঠক মন্তব্য () টি

জেরুসালেমের জন্য তৃতীয় ইনতিফাদা

ট্রাম্পের নিজের ক্ষমতা সংহত করা ছাড়া এর পেছনে আর অন্য কোনো উদ্দেশ্য…

জেরুসালেমের পর কি মক্কা?

ট্রাম্পের ঘোষণা হবে পূর্ববর্তী আন্তর্জাতিক চুক্তির পাশাপাশি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতার একটি…

সাদাত থেকে সালমান: ফিলিস্তিনের বিনিময়ে ইসরাইলকে পাওয়া

যারা ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে তাদের কঠোর বিচার করবে ইতিহাস।

কপিরাইট ২০১৪ onlineBangla.com.bd
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: গুলবুদ্দিন গালীব ইহসান
অনলাইন বাংলা, ৬৯/জি গ্রিন রোড, পান্থপথ (নীচ তলা), ঢাকা-১২০৫।
ফোন: ৯৬৪১১৯৫, মোবাইল: ০১৯১৩৭৮৯৮৯৯
ইমেইল: contact.onlinebangla@gmail.com
Developed By: Uranus BD