সর্বশেষ আপডেট ১৩ ঘন্টা ৩৮ মিনিট আগে
আপনি আছেন হোম / মতামত / কলাম / কোরবানির তাগিদ

কোরবানির তাগিদ

প্রকাশিত: ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ১০:৩৫ টা

মতামত ডেস্ক,অনলাইন বাংলাঃ

২৩ আগস্ট সন্ধ্যায় বাংলাদেশের আকাশে মাস ঘুরে আবারও একটি নতুন চাঁদ দেখা গেছে। এ চাঁদটির বিশেষত্ব আছে। এর দশম দিনে বাংলাদেশের ঘর ঘরে খুশির উৎসব পালিত হবে। এদিন সকালে লোকজন নতুন বা পরিষ্কার জামাকাপড় পরে বড় মাঠ বা চত্বরে জমায়েত হবেন। সেখানে একসঙ্গে প্রার্থনা করবেন। তারপর যাদের সাধ্য আছে তারা নিজ বাড়ির আঙ্গিনায়, উঠানে বা রাস্তায় পশু জবাই করে তার গোশত স্বজন ও গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দেবেন। তিন দিন ধরে চলে এ পশু জবাই ও গোশত বিলানোর উৎসব।

এ উৎসবকে বলা হয় ঈদুল আযহা। এদিনের পশু জবাইয়ের প্রথাকে বলা হয় কোরবানি। ইসলামী হিজরি সনের  দ্বাদশ বা সর্বশেষ মাস জিলহজের দশম দিনে উৎসবটি পালিত হয়। যেহেতু আমরা এখন ঈসায়ী বা বহুল প্রচলিত ‘ইংরেজি’ সনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি, তাই সহজ হিসাবের জন্য বলছি ২ সেপ্টেম্বরই এবারের ঈদের দিন পড়েছে।

চন্দ্র পঞ্জিকা অনুসারে হিজরি সন গণনা করা হয়, এর সঙ্গে সৌর বছরের অন্তত এগার দিনের ব্যবধান রয়েছে। ফলে সময়ের পরিক্রমায় বছরের নানা সময়ে নানা ঋতুতে নির্দিষ্ট মাসের চাঁদ দেখা সাপেক্ষে মুসলমানদের ঈদ উৎসব পালিত হয়।

ঋতুর বিচার করলে এবার বাংলাদেশে ঈদুল আযহা পালিত হচ্ছে ভাদ্র মাসে। শরৎকালের এ মাসটিতে সূর্যের অবস্থান থাকে ভদ্রা নক্ষত্রে। ফলে এ মাসে সূর্যের তাপটা এমন হয় যাকে বলা হয় ‘তালপাকা রোদ’ আর বাতাসেও বেশ আদ্রতা থাকে। এ মাসে বর্ষার পানিতে ধোয়া বিল-মাঠ-রাস্তা রোদে শুকিয়ে বেশ সুন্দর হয়ে ওঠে। আবার ভোরবেলা ঘাসের ডগায় শিশিরেরও দেখা মিলে। এমন একটা সময়ে উৎসবের দিন পড়ায় খুশির মাত্রা বেশ বড় হওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু এবার ঈদের আগে আগে দেশের বড় অংশজুড়ে বড় আকারের আকারের বন্যা হয়েছে। ভারত থেকে নেমে আসা প্রবল বর্ষণ ও বন্যার পানি বাংলাদেশের চার প্রধান নদ-নদী ব্রহ্মপুত্র-পদ্মা-মেঘনা-যমুনা ছাপিয়ে গেছে। এতে করে দেশের উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলের জেলাগুলো ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়েছে।  মোটা ২১টি জেলায় অন্তত ৩৩ লাখ লোক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফসল নষ্ট হয়েছে ৬ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর জমির। বন্যায় নিহত হয়েছে অন্ততঃ সোয়াশ’ মানুষ।

এ বন্যা দুর্গতরা, গত এপ্রিলে ফসল তোলার আগেই ফসলহানির শিকার হাওর এলাকার কৃষকেরা এবং পাহাড় ধসে নিহত ব্যাপক সংখ্যক মানুষের পরিবার এবার কিভাবে ঈদ উদযাপন করবে কে জানে!

আরেকটা বড় দুর্ভাবনার কারণ হয়েছেন দেশের উত্তর, মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চলের কৃষকরা।  বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের সবচেয়ে বড় উৎসবকে লক্ষ্য করে তারা পশু পালন করে থাকেন। বিশেষ ভারত থেকে গরু আসা কমে আসায় গত দু-তিন বছর ধরে কোরবানির পশুর যোগানের বেশির ভাগের দায়িত্বই তারা পালন করছেন। এতে করে তারা বেশ লাভের মুখও দেখছেন। এবারের ঈদ বাজারের জন্য আগের বছরগুলোর চেয়েও বেশি সংখ্যক পশু লালন-পালন করেছেন কৃষকেরা কিন্তু উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের ভয়াবহ বন্যার কারণে তারা মারাত্মক বিপাকে পড়েছেন। বন্যা থেকে নিজেরা বাঁচতে কোনো মতে বাড়িঘরে মাচান করে, বড় রাস্তা-বাঁধে বা আশ্রয় কেন্দ্রে গিয়ে হাজির হয়েছেন। কিন্তু বেশির ভাগ কৃষকই গরু-ছাগলের জন্য তেমন কিছু করতে পারেননি। ফলে অনেক পশু দিনের পর দিন পানিতে ভিজেছে, নিয়মিত খাবার পায়নি। এতে তাদের স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে গেছে, অনেকগুলো অসুস্থ হয়ে পড়েছে। নিরুপায় হয়ে কেউ কেউ ঈদ বাজারের আগেই পানির দরে গরু-ছাগল বিক্রি করে দিয়েছেন।

২.
বাংলাদেশে এক সময় বন্যা হলে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য হিড়িক পড়ে যেত। রাজনৈতিক দলের শীর্ষ থেকে তৃণমূল নেতারা বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে ভোটের হিসাব ঠিক রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন। ছাত্র সংগঠন, সামাজিক সংগঠন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পেশাজীবীরা পর্যন্ত ত্রাণ নিয়ে দুর্গত এলাকায় ছুটে যেত।

কিন্তু নিম্ন আয়ের বাংলাদেশ যতই মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হচ্ছে ততই মানুষের প্রতি মানুষের অঙ্গীকার যেন শিথিল হয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক-সামাজিক কোনো স্তরেই এখন আর মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তেমন তাগিদ দেখা যায় না।

সমাজের বিশেষ নৈর্বত্তিক দশার কারনেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আবার এর ছাপ মানুষের চিন্তাভাবনাকেও প্রভাবিত করছে। যেমন এবারের বন্যাকে সামনে রেখে কোরবানি নিয়ে বেশ চাঞ্চল্যকর বিতর্ক তৈরি হয়েছে। শিক্ষিত লোকদের কেউ কেউ বলছেন এবারের ঈদে তারা পশু কোরবানি করবেন না। বরং এর টাকা দিয়ে বন্যার্তদের ত্রাণ দেবেন।

যেহেতু কোরবানি আবশ্যকীয় তথা ওয়াজিব এবাদত, তাই ধর্মীয় পরিমণ্ডলে এ কথা নিয়ে বেশ তর্ক হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে বন্যার্তদের সাহায্যের কথা বলে কোরবানিকে এড়িয়ে যাওয়া সবার সমর্থন পায়নি। কেউ কেউ এতে মানবিকতার নামে ইসলাম বিরোধিতার ব্যাপারও দেখছেন। আগের বছরগুলোতে ‘পশু হত্যা’ বা ‘পশুদের কষ্ট’ দেয়ার কথা বলে কোরবানির বিরোধিতা করেছে একটা ছোট্ট পক্ষ, এবারের আহ্বানকে তারই ধারবাহিকতা মনে করছেন কট্টর ধর্মানুরাগীরা। একটু উদারপন্থীরা একে ধর্ম সম্পর্কে ঠিকমতো না জানার কারণ হিসেবে দেখে তাদের লক্ষ্য করে কোরবানি তত্ত্ব সংক্রান্ত আলোকায়নের পথ বেছে নিয়েছেন।

এ বিতর্কে আমি একটা লিবারেল জায়গা বেছে নিয়েছিলাম। আমি মনে করেছি,  যার সামর্থ আছে তিনি কোরবানি ও ত্রাণ দুইটাই দিতে পারেন। কারও সামর্থ কম থাকলে শুধু কোরবানি দেবেন। আর ত্রাণকে বেশি পছন্দ করলে শুধু ত্রাণই দেবেন। কোরবানি বা ত্রাণ, কোনোটি দেয়া নিয়ে জোরাজুরির কিছু নাই।

আমার এই পজিশনের মূলে যে কোনো শরীয়তি ভিত্তি আছে এমন না। আগেই বলেছি আমার জায়গাটা লিবারেল ছিল, তাই এভাবেই গ্রহণ করেছিলাম বিতর্কটাকে। মুশকিল হলো, আমি একজন ধার্মিক মানুষও, লিবারেলিজম বা লজিক দিয়ে কোনো ব্যাপারকে ব্যাখ্যা করতে পারলেও ধর্মের মধ্যে তারা সুরাহা না দেখলে আমি স্বস্তি পাই না। বরং আমাকে ধর্মের জায়গা থেকে আশ্বস্ত হতে হয়।

আমার কাছে মনে হয়েছে, যারা কোরবানির টাকা দিয়ে ত্রাণ দিতে চান, তাদের মধ্যে দু-একজন নানা ফেরকার, নানা ধান্দার লোক থাকতে পারে, কিন্তু বড় অংশের মধ্যে ধর্মের লজিকই কাজ করেছে। মানে তারা দেখেছেন যে, মানুষের মাঝে গোশত বিলানো যেমন ভালো কাজ, তেমনি ত্রাণ দেওয়াও ভালো কাজ। প্রতি বছরই তারা কোরবানি দেন, এবার বন্যাদুর্গতদের বিপদটা আকস্মিক ও নগদ, কাজেই এবার না হয় তাদের জন্যই অর্থ খরচ হোক। লজিকের জায়গায় দেখলে দুটি ভালো কাজের মধ্যে জরুরি কাজটাকে তারা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন।

মানুষের এই যুক্তিবোধ ফেলনা নয়। কারণ এর উৎসমূল ইসলামের সওয়াবের চিন্তা। ভালো কাজ মাত্রই সওয়াবের কাজ। যার ভাণ্ডারে যত সওয়াজ জমা হবে, আখেরাতে পুরস্কার হিসেবে জান্নাত পাওয়া তার জন্য সহজ হবে। আর জান্নাত মানে সুখে শান্তিতে অনন্তকাল আরাম-আয়েশে বসবাস করার বিরাট সুযোগ। ফলে যে কাজকে বেশি সওয়াবের মনে হয়, সে কাজকে অগ্রাধিকার দিয়ে তার জন্য অর্থ খরচ করতে তারা কসুর করেন না। বরং যেটা তাৎক্ষণিক, জরুরি, বেশি মানবিক- তাতে সাড়া দেওয়ার তাগিদ বোধ করেন তারা। কাজেই কোরবানি ও ত্রাণকে অল্টারনেটিভ হিসেবে দেখাটা অযৌক্তিক নয়।

আগেই বলেছি, এই যুক্তিবিরোধীরা উগ্র ধর্মানুরাগী সমালোচক ও উদার আলোকায়নবাদী- এমন দুভাগে বিভক্ত হয়েছেন। যদি লিবারেল জায়গাটাকেও বিরোধিতা হিসেবে বিবেচনায় নেই, তাহলে তিনটা বিরোধী পক্ষ হলো বলা যায়।

হ্যা, ত্রাণপন্থীরা, তাদের যুক্তিবিরোধী উগ্র ধর্মানুরাগী সমালোচকরা, উদার আলোকায়নবাদী এবং আমার লিবারেল জায়গা- এই চারটাই ভুল। যদি ইসলামকে আমার কাছে মানুষের লাভক্ষতির ধান্দার চেয়ে আরও বড় কিছু মনে করি তাহলে সত্যিই নিজেদের ভুল জায়গাগুলা দেখতে পাব।

আমরা যদি ইসলামকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা না করে এর ভেতর থেকে বোঝার চেষ্টা করি তাহলে দেখতে পাব যে বন্যার্তের সাহায্য করা, আবার আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি করে মানুষকে গোশত বিলিয়ে দেয়ার মধ্যে আসলে কোনো বিরোধ নাই। বরং সব মানবিক আকুতি আর প্রাণের দরদের মধ্যেই আমরা ইসলামকে খুঁজে পেতাম এবং ইসলাম তার প্রকৃত অবস্থান থেকে কত বৈচিত্র, কত বিচিত্রতা ও বিরোধকে ধারণ করে তা বুঝতে পারতাম।

৩.
ইসলামের কেন্দ্রীয় ধারণা হলো তৌহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদ। এ ধারণা খুবই সুনির্দিষ্ট: আল্লাহ বিশ্ব জাহানসহ সবকিছুর স্রষ্টা, তার কোনো শরিক নেই; আর সব সৃষ্টির মতো মানুষেরও কাজ হলো আল্লাহর হুকুম মেনে চলা।

অনেকেই ইসলামের এ মূলনীতিকে  বুঝতে গিয়ে দুনিয়ার সব ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, ইতিহাসকে বুঝে ফেলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মর্মবাণী উপলব্ধি করতে পারেন না, ইসলামের মূল সুর বা সব বক্তব্যের প্রকৃত অর্থের কিছুই আর খুঁজে পান না। এর মূল কারণ হলো ইসলাম মানুষকে কিভাবে দেখে তা বুঝতে না পারা এবং ইসলাম আসলে কী চায় তা উদঘাটন করে সঠিক সাড়া না দেওয়া।

মানুষের ব্যাপারে আল্লাহর প্রথম ভাবনার কথা পাওয়া যায় কুরআন শরীফে। পৃথিবীতে নিজের প্রতিনিধি কাউকে পাঠানোর কথা ভাবতে গিয়ে মানুষের কথা ভাবেন আল্লাহ। একদিন তিনি ফেরেশতাদের বলেন, ‘নিশ্চয় আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি পাঠাব’। এ কথা শুনে ফেরেশতারা জানতে চাইলেন, ‘আপনি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে পাঠাবেন যে বিশৃঙ্খলা ও রক্তপাতের জন্ম দেবে; আর আমরা তো খুশির সঙ্গেই আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করি এবং প্রশংসা করি, আর আমরা আপনার নিষ্কলুষতার কথাও ঘোষণা করি’। এ সময় ফেরেশতাদের আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় আমি যা জানি, তোমরা তা জানো না’। (সূরা বাকারার ৩০ নম্বর আয়াত অবলম্বনে)।

আল্লাহ আঠারো হাজার মখলুকাতের (প্রজাতি) স্রষ্ঠা। তার মধ্যে নিজের প্রতিনিধি হিসেবে যে প্রজাতিকে সৃষ্টি করলেন তার ডাকনাম রাখলেন ‘ইনসান’। আরবি এ শব্দটি উনুস ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো ভালোবাসা বা প্রেম। আল্লাহ নিজে দয়ালু, প্রেমময় ও ক্ষমাশীল। কিন্তু তার কোনো শরিক নাই, সঙ্গী-সাথী নাই। তার সব ভালোবাসা-তার সব প্রেম সৃষ্টিকে ঘিরে। ফলে যে প্রজাতিকে আল্লাহ নিজের প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নিয়েছেন তাদের সত্তার মধ্যেও তিনি ভালোবাসা ও প্রেম দিয়ে দিয়েছেন।

খেয়াল রাখার বিষয়, প্রতিনিধি হিসেবে মানুষকে আল্লাহ আরও বড় নেয়ামত  দিয়েছেন। স্বাধীনতা। হ্যা, সমগ্র বিশ্বজাহানে আল্লাহ ছাড়া সবাই সৃষ্টি, তাই তিনি ছাড়া কারোরই কোন স্বাধীনতা নেই। কিন্তু মানুষকেই তিনি স্বাধীনতা দিয়েছেন।  মানুষের রয়েছে ইচ্ছা বা বাসনা, যার ওপর কর্তৃত্ব করার ক্ষেত্রে সে সম্পূর্ণ স্বাধীন। মানে নিজের খায়েশ মতো চলতে পারে সে।

উল্লেখ্য, মানুষের আগেও পৃথিবীতে আল্লাহ খলিফা পাঠিয়েছিলেন। তারা হলেন জ্বীন প্রজাতি। তাদেরও খায়েশের ব্যাপারে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।

এবার আমরা যদি মানুষ ও জ্বীনের কাজ সম্পর্কে আল্লাহর ভাষ্য জানি তাহলে বুঝতে পারবো যে মানুষের আসল ব্যাপারটি কি। কুরআন শরীফে আল্লাহ বলেন, ‘আমি জ্বীন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি শুধু আমার এবাদত করার জন্য।’ (সূরা যারিয়াতেরা ৫৬ নম্বর আয়াত)। এবাদত বা বন্দেগী আসলে কী? কিছু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতাই কি এবাদত? মানুষের খেয়ালখুশি মতো চলার স্বাধীনতা থাকা সত্ত্বেও ভালোবেসে আন্তরিকভাবে আল্লাহর কথা মতো চলাই এবাদত। এর দুটি দিক রয়েছে। প্রথমতঃ আল্লাহ যা বলেছেন হাসিমুখে তা করা, দ্বিতীয়তঃ আল্লাহ যা বারণ করেছেন তা না করে সন্তুষ্ট থাকা। এবাদতের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, ‘তাদেরকে এছাড়া কোন নির্দেশ দেয়া হয়নি যে তারা খাঁটি মনে আন্তরিকভাবে আল্লাহর এবাদত করবে।’ (সূরা বাইয়িনাতের ৫ নম্বর আয়াত)।

কাজেই পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি ও বান্দা হিসেবে যে মানুষের পরিচয় পাওয়া গেল, তার সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো স্বেচ্ছায় স্বাধীনভাবে আন্তরিকতার সঙ্গে আল্লাহর কথা মেনে চলা।

৪.
ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী দুনিয়া হচ্ছে মানুষের পরীক্ষা ক্ষেত্র। এখানে প্রতিনিধি ও বান্দা হিসেবে প্রত্যেক মানুষ কতখানি ইসলামের মূলনীতির অনুসরণ করেছে, তার আলোকে আল্লাহর বন্দেগী করছে, না করছে তার পরীক্ষাই হচ্ছে। জীবনের সবকিছুকে ঘিরেই যেহেতু পরীক্ষা, সেহেতু সবকিছুতেই ইসলামের নীতিগত অবস্থান, প্রক্রিয়া, পদ্ধতি ও চর্চার প্রতিফলন ঘটাতে প্রতিনিয়ত নানা আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক  তার অনুশীলনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যেমন নামাজ-রোজা-হজ-দোয়া-কালাম-জিকির-কুরআন পাঠ।

এসব অনুশীলনের মধ্য দিয়ে ইসলাম মানুষকে প্রস্তুত করলেও তার বিচার্য হলো দুটি ব্যাপার। এক. আমল তথা মানুষের আচরণ-লেনদেন-সম্পর্কের মধ্যে ইসলামের মূলনীতির বহিঃপ্রকাশ ঘটে কি না।  দুই. ভালোবাসা তথা আল্লাহকে ভালোবেসে আন্তরিকতার ও নিষ্ঠার সঙ্গে ইসলামের মূলনীতি অনুসরণ করা হয় কি না।

মূলতঃ ইসলামের নানা অনুশীলনের মধ্যে আমলের বিষয়টা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে এবং প্রথাগতভাবে ইসলামী ভাষ্যের বেশির ভাগ জুড়ে আমলের কথাই উল্লেখ করা হয়ে থাকে। কিন্তু আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার ব্যাপারটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর বোঝাপড়াকে অনেকটা কম গুরুত্ব দেওয়া হয় বলে পরিলক্ষিত হয়।

বিশেষতঃ যোগাযোগ প্রযুক্তি ও সামাজিক মাধ্যমের ব্যাপক বিকাশের বর্তমান জমানায় ইসলামের বিশুদ্ধতাবাদী নানা গোষ্ঠীর তৎপরতা লক্ষ্য করা যায় তারা ধর্মীয় অনুশীলনগুলোর আক্ষরিকরূপ কঠোরভাবে চর্চার জন্য আগ্রাসী প্রচার-প্রচারণা চালান। কিন্তু আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা নিবেদনের বিষয়কে তারা উপেক্ষা করেন। বিশেষ এ সংক্রান্ত প্রথা-প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্য দিয়ে ইসলাম যে বক্তব্য হাজির করে তাকে প্রচলিত আমলের বয়ানের মধ্যে চেপে রাখেন।

যেমন কোরবানি। এটি হলো আল্লাহর প্রতি মানুষের ভালোবাসা নিবেদনের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান। এর মধ্য দিয়ে ইসলাম আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা নিবেদনের রূপরেখা স্পষ্ট করেছে। কোরবানিতে দেখা যায় পশুকে আল্লাহর নামে উৎসর্গ করে জবাই করা হয়। কিন্তু সেই পশুর গোশত বিলিবণ্টন করা হয় আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে। এর প্রথম ভাগ পায় গরিব মানুষ, দ্বিতীয় ভাগ কোরবানি দাতা, তৃতীয় ভাগ আত্মীয়-বন্ধুরা পান। এর মানে হলো উৎসর্গ হয় আল্লাহর নামে, কিন্তু তার প্রতিফল বণ্টন করা হয় আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে।

মূল ব্যাপার আসলে এটিই, আল্লাহকে ভালোবাসা নিবেদন করতে হলে তা তার বান্দাদের মধ্য দিয়েই করতে হয়। মানুষের পাশে না দাঁড়িয়ে, মানুষকে ভালো না বেসে, তার ব্যথার দোসর না হয়ে আল্লাহর ভালোবাসা যায় না।


কোরবানির প্রচলিত মানে হলো আল্লাহর নামে উৎসর্গ করে পশু জবাই করা। তবে ইসলামে কোরবানির প্রকৃত মানে আরও ব্যাপক অর্থ বহন করে। কোরবানি শব্দটি এসেছে আরবি ‘কুরব’ ধাতু থেকে। এর অর্থ হলো দুটি সত্ত্বার কাছাকাছি চলে আসা তথা নৈকট্য বা সান্নিধ্য অর্জন করা।

দুটি চুম্বক খণ্ডকে কাছাকাছি আনলে যে পরষ্পপরের মধ্যে যে টানের সম্পর্ক তৈরি হয় তাই নৈকট্য। কোরবানির মধ্য দিয়েও আল্লাহ ও মানুষের মধ্যে টানের বা নৈকট্যের সম্পর্ক তৈরি হয়। বান্দাকে কোরবানি দিতে দেখলে আল্লাহ অত্যন্ত খুশি হন।

সূরা হজের ৩৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ জানিয়েছে তিনি সব জাতির জন্য কোরবানির নিয়ম রেখেছেন। ইতিহাসে প্রথম কোরবানি করেন প্রথম মানুষ আদিপিতা হযরত আদমের (আ.) দুই ছেলে হাবিল ও কাবিল। তাদের মধ্যে হাবিল মুত্তাকি ছিলেন, তাই তার কোরবানি কবুল হয়েছিল। অন্যদিকে কাবিলের কোরবানি কবুল হয়নি।

অন্য জমানার মানুষেরা তাদের নবীদের নিয়ম অনুসারে কোরবানি করেছেন। তবে প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ’ বছর ধরে মুসলমানরা যে কোরবানি করে আসছে তা তাদের নবী মুহাম্মদ (সা.) প্রবর্তিত প্রথা বা সুন্নত নয়। বরং তার নির্দেশনায় প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগের নবী ইবরাহীমের (আ.) সুন্নত অনুসরণ করে মুসলমানরা কোরবানি করছে।

হযরত ইবরাহীমকে (আ.) বলা হয় খলীলুল্লাহ বা আল্লাহর বন্ধু। আল্লাহ তাকে অনেক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি করেছেন। কিন্তু প্রতিবারই তিনি আল্লাহর অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস রেখেছেন। যেমন তাকে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে ফেলে দেয়া হলেও তিনি মোটেই ঘাবড়াননি। বরং আল্লাহর প্রতি ভরসা করে আগুনের দিকে এগিয়ে গেছেন। আল্লাহর প্রতি ইবরাহীমের (আ.) প্রশ্নাতীত আনুগত্য এবং তুলনাহীন গভীর প্রেমে মুগ্ধ হয়ে আল্লাহ তাকে নিজেরে একান্ত বন্ধু বা খলীল ঘোষণা করেছেন।

এই বন্ধুকে পরীক্ষা করার জন্য আল্লাহ তাকে স্বপ্নযোগে নিজেরে সবচেয়ে প্রিয় চিজকে উৎসর্গ করার আদেশ দেন। ইরাহীম (আ.) জিলহজ মাসের ৭, ৮ ও ৯ তারিখ পর পর তিন দিন দৈনিক একশটি করে মোট তিনশ’ কোরবানি দেন। কিন্তু কোনো দিন তার কোরবানি কবুল হয়নি। বরং প্রতিদিনই তাকে ফের নিজের সবচেয়ে প্রিয় চিজকে কোরবানি করতে বলা হয়। তখন তার খেয়াল হলো উট নয়, তার সবচেয়ে প্রিয় হলো ছেলে হযরত ইসমাঈল (আ.)।

শিশু ইসমাঈলকে (আ.) আল্লাহর আদেশের কথা জানান তার বাবা। এ কথা শুনে আল্লাহর জন্য সাদরে জবাই হতে রাজি হয়ে যান তিনি। ১০ জিলহজ তারিখে আল্লাহর আদেশ মেনে তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য ছেলের গলায় বাবা ছুরি চালিয়েও দেন। কিন্তু আল্লাহর আদেশে ছুরি ইসমাঈলের (আ.) গলায় বসেনি।

তবে বাবা যে নিজের প্রাণপ্রিয়কে আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করতে চেয়েছেন আর ছেলেও যে আল্লাহর জন্য কোরবানি হতে প্রস্তুত ছিলেন তা মঞ্জুর করেন আল্লাহ। তিনি সবচেয়ে সম্মানিত ফেরেশতা জীবরাঈলের (আ.) মাধ্যমে ইসমাঈলের (আ.) জায়গায় একটি দুম্বা পাঠিয়ে দেন। ইবরাহীম (আ.) কয়েকবার চেষ্টার পর শেষবার ছেলে মনে করে চোখ বুঝে ছুরি চালিয়ে দেন, পরে দেখতে পান যে তিনি আল্লাহর পাঠানো দুম্বা জবাই করেছেন।

৪.
বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থা পুঁজিতান্ত্রিক। যার মানে হলো মানুষ তার ব্যক্তিগত সম্পদের সাহায্যে যতখানি সম্ভব মুনাফা অর্জন করতে পারবে। এই মুনাফাখোরিই হলো মানুষের দুনিয়াবি জীবনের সবকিছুর কেন্দ্র বিন্দু। মুনাফার জন্য মানুষ তার অপর একটা মানুষকে যন্ত্রের মতো ব্যবহার করলেও দোষ নাই। টাকা দিয়ে কলকব্জা কিনে তা ব্যবহার করে পণ্য উৎপাদন করে যেমন মুনাফা কামানো যায়, তেমনি টাকা দিয়ে মানুষের শ্রমকে কিনে তা দিয়ে পণ্য উৎপাদন করে মুনাফাই কামানো যায়। এক্ষেত্রে যন্ত্র আর মানুষকে এক করে ফেলায় দোষ নাই। মুনাফাই যেখানে শেষ কথা সেখানে শোষণ, নিপীড়নে কী আসে যায়।

সত্যিকার অর্থে বিশ্ব ব্যবস্থার বাস্তবতা এটিই। যদিও মানবাধিকার, মানবিকতা, গণতন্ত্রের কথা বলে পুঁজিবাদের শোষণকে সব সময় কম সহনশীল রাখার এবং এর প্রতি মানুষ যেন চূড়ান্তভাবে ক্ষেপে না যায় তার জন্য নানা আয়োজন আছে পুঁজিবাদের নিজেরই। তা সত্ত্বেও কিছু মানুষের মুনাফারখোরির কাছে বাকি মানুষের যন্ত্রের মতো ব্যবহৃত হওয়ার বিষয়টিই অমোঘ সত্য।

এ সময়ে আমরা দেখেছি কিভাবে পুঁজিতন্ত্রের লজিকের কাছে সবাই আত্মসমর্পণ করেছে। কিছু মানুষ মুনাফা কামাবে, আর কিছু মানুষ তার জন্য যন্ত্র হিসেবে শোষিত হবে এটি সবাই মেনে নিয়েছে। এমনকি ইসলামের প্রাক্টিসের মধ্যেও এই ব্যাপার ঢুকে পড়ছে। মানুষকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে, দুনিয়াতে মানুষের কী কাজ- তার ব্যাপারে ইসলামের নীতিগত অবস্থানগুলোকে এখন কৌশলে অস্বীকার করা হচ্ছে। অন্যদিকে মুনাফাখোরিকে ঠিক আছে বলা হচ্ছে।

এই ব্যাপারটা হালাল পুঁজির নামে ঘটেছে। ইসলামিক ফিন্যান্সের নামে যার তৎপরতা চলছে, যেখানে মুনাফা অর্জনই শেষ কথা,। ইসলামিক ফিন্যান্সের ক্ষেত্রে পুরো পুঁজিবাদী লজিকই কাজ করে, কিন্তু শোষণ-বড়সর মুনাফাখোরির ব্যাপারগুলানকে শুধু ইসলামী তকমা দিয়ে আড়াল করা হয়।

আর আমরা যারা সাধারণ মুসলমান, তারাও ধরে নিয়েছি যাদের সম্পদ আছে তারা মুনাফা কামালে অসুবিধা নাই, আর যাদের টাকা নাই তারা অপরের মুনাফা কামানোর জন্য যন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হলে তাতেও দোষ নাই। যেন মুসলমান ধনী বা গরিব যেই হোক না কেন তার জন্য আল্লাহ সুর্দিষ্ট কর্তব্য নির্ধারণ করে দেননি, বলেননি এর বাইরে অন্য কিছু করলে, যেমন মুনাফাখোরির কর্তা বা যন্ত্রে পরিণত হলে আল্লাহর নির্দেশ লঙ্ঘন করা হয় না।

এমন একটা প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে কোরবানিকে বিচার করার প্রয়োজন আছে। আমরা যখন কোরবানি করছি, তখন কি নৈকট্যের কিছু ঘটছে? আমরা কি আল্লাহর কাছে যেতে পারছি, আর তিনিও কি আমাদের কাছে আসছেন? নাকি প্রথার অনুসরণ করে ফি বছর কোটি কোটি পশু জবাই করে প্রথার আনুষ্ঠানিকতাই যাপন করে চলছি?

সূরা হজের ৩৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না তোমাদের কোরবানির গোশত এবং রক্ত; বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া (আল্লাহভীতি)।’ নবীজীর (সা.) হাদীস অনুযায়ী, কোরবানির রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই তাকওয়া আল্লাহর কাছে পৌঁছে যায়।

এখন প্রশ্ন হলো সত্যিই কি আমাদের মধ্যে তাকওয়া আছে? যদি থেকেও থাকে, তাহলেও কি আমরা মানি যে- একমাত্র প্রভু বা কর্তৃত্বকারী হলে আল্লাহ, তার কোনো শরিক নেই। বিশ্বের আর সবকিছুর মতো মানুষও আল্লাহরই সৃষ্টি। কাজেই এক মানুষের সঙ্গে অপর মানুষের কোনো পার্থক্য নেই।

আসলে সত্যিকারের তাকওয়াবান হতে হলে আমাদের মানতেই হবে যে, সব মানুষ সমান। বর্ণ-লিঙ্গ-জাতীয়তা-ভাষা-আঞ্চলিকতার কিছুই এক মানুষকে অপরের চেয়ে ছোট বা বড় করে না। কোনো মানুষের উপরই বেইনসাফি-শোষণ-নিপীড়ন চলতে পারে না। সবাই সমান, সবাই ভাই ভাই। আল্লাহকে ভালোবেসে অপর ভাইকেও ভালোবাসতে হবে, বুকে জড়িয়ে ধরতে হবে।

কোরবানির মধ্য দিয়ে আল্লাহর কাছে এই তাকওয়া পৌঁছাক। আমীন।

পাঠক মন্তব্য () টি

তারেক রহমান: আপনার প্রধান প্রতিপক্ষ তথ্যসন্ত্রাস

আপনার দুর্ভাগ্য আপনি আধিপত্যবাদী শক্তির শিখন্ডি গোষ্ঠীর তথ্যসন্ত্রাসের নির্মম শিকার।

ভারতে অর্থনৈতিক মন্দার শঙ্কা

মোদি সরকারের নীতির ভারনীয় অর্থনীতির পতন আসন্ন।

কুর্দিদের ভবিষ্যৎ

নিপীড়ন এবং সহিংসতা কখনোই কুর্দি সমস্যার সমাধান করবে না।

কপিরাইট ২০১৪ onlineBangla.com.bd
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: গুলবুদ্দিন গালীব ইহসান
অনলাইন বাংলা, ৬৯/জি গ্রিন রোড, পান্থপথ (নীচ তলা), ঢাকা-১২০৫।
ফোন: ৯৬৪১১৯৫, মোবাইল: ০১৯১৩৭৮৯৮৯৯
ইমেইল: contact.onlinebangla@gmail.com
Developed By: Uranus BD