সর্বশেষ আপডেট ১৩ ঘন্টা ৩৮ মিনিট আগে
আপনি আছেন হোম / মতামত / সম্পাদকীয় মন্তব্য / কার মনের পশু জবাই করতে হবে?

কার মনের পশু জবাই করতে হবে?

প্রকাশিত: ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ০৯:৪৮ টা | আপডেট: ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ১০:০৭ টা

সম্পাদকীয় মন্তব্য, অনলাইন বাংলাঃ

কবি কাজী নজরুলের নামে চলছে প্রচারণা। বছরের পর বছর। তিনি নাকি বনের পশুরে জবাই না করে মনের পশুরে জবাই করতে বলেছেন।

‘মনের পশুরে কর জবাই, / পশুরাও বাঁচে, বাঁচে সবাই।’ নজরুলের এ কথার বরাতে লোকজন বলছে গরু-ছাগল নয়, কোরবানি করতে হবে মনের পশু তথা হিংসা-বিদ্বেষকে। এটি ডাহা মিছা কথা। নজরুল মনের পশু বলতে এমন কিছু বোঝাননি।

নজরুল মনের পশু বলতে বুঝিয়েছেন নাফরমান মুসলমানের পরাধীনতা মেনে নেওয়ার মানসিকতাকে।

মুসলমানদের স্বাধীনতা ও অধিকার পদানত হওয়া সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে লড়াই না করে প্রতি বছর ঈদুল আযহায় পশু কোরবানিকে সমালোচনা করতেই নজরুল একথা বলেছেন।

নজরুলের কথা হলো, হযরত ইবরাহীম (আ.) যেমন নিজের পুত্রকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি করেছিলেন তেমনি স্বাধীনতা ও অধিকারের জন্য বর্তমানের মুসলমান সন্তানদের জীবন কোরবানি করতে হবে।

সেই ত্যাগ না করে শুধু পশু কোরবানির কঠোর সমালোচনা করেছেন নজরুল। তিনি এর মাধ্যমে মুসলমানদের স্বাধীনতার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন।

মনের পশু জবাইয়ের তাগিদের প্রেক্ষাপট

কাজী নজরুল ১৯১৭ সালের আগস্টে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯২০ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে ওই বছরের এপ্রিলে ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভেঙে দেয়া হয়। তখন সেনাবাহিনী ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন নজরুল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পশ্চিমা দুটি পক্ষের মধ্যে সংঘটিত হয়। এক পক্ষে ছিল জার্মানি, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়ার সমন্বয়ে গঠিত কেন্দ্রীয় শক্তি। অপরপক্ষে ছিল ব্রিটেন, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, সার্বিয়া, জাপান, ইতালি ও আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত মিত্রশক্তি।

এই যুদ্ধে মুসলিম সাম্রাজ্য উসমানিয়া খেলাফত কেন্দ্রীয় শক্তির পক্ষাবলম্বন করে এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গে পরাজিত হয়। ফলে সমগ্র আরব ও ইস্তানবুল বৃটিশ ও ফরাসি সাম্রাজ্যের দখলে চলে যায়।

কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন প্রায় সোয়া দুইশ’ বছর ধরে ইংরেজের দখলে থাকা সাবেক মুসলিম সাম্রাজ্য ভারতের সন্তান। সেই পরাধীনতার বেদনার উত্তরসুরি নজরুল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয়ের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন।

এ কারণে স্বদেশে ফেরার পরপরই নজরুল পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে লড়াই শুরু করেন। তিনি মুসলমানসহ ভারতবর্ষের সকল পরাধীন মানুষকেই লড়াইয়ের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন।

স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য লড়াইয়ের বাণীই প্রকাশিত হয়েছে নজরুলের প্রথম দিককার লেখালেখিতে। এর মধ্যে নজরুলের কোরবানী ও ঈদ বিষয়ক কবিতাও রয়েছে। দেশে ফেরার বছর ১৯২০ সালেই তিনি ‘কোরবানী’ কবিতা লেখেন। এরপর ১৯২১-১৯২৪ সালের মধ্যে লেখেন ‘শহীদী ঈদ’ কবিতা।

দুটি কবিতাতেই নজরুল স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য ভারত বর্ষের পরাধীন মুসলমানদের উদ্বুদ্ধ করেন। এর মধ্যে ‘শহীদী ঈদ’ কবিতায় নজরুল মনের পশু জবাই করার কথা বলেন। এ কবিতাটি পুরোপুরি পড়লেই বুঝা যায় তিনি মনের পশু বলতে কী বুঝিয়েছেন এবং স্বাধীনতার জন্য মুসলমানদের আত্মত্যাগ করাকে কোরবানি বুঝিয়েছেন।

আসুন পড়ি নজরুলের শহীদী ঈদ কবিতা-


 শহীদী-ঈদ
 -কাজী নজরুল ইসলাম


শহীদের ঈদ এসেছে আজ
শিরোপরি খুন-লোহিত তাজ,
আল্লাহর রাহে চাহে সে ভিখ্:
জিয়ারার চেয়ে পিয়ারা যে
আল্লার রাহে তাহারে দে,
চাহি না ফাঁকির মণিমানিক।


চাহি না ক’ গাভী দুম্বা উট,
কতটুকু দান? ও দান ঝুট।
চাই কোরবানী, চাই না দান।
রাখিতে ইজ্জত্ ইসলামের
শির চাই তোর, তোর ছেলের,
দেবে কি? কে আছ মুসলমান?


ওরে ফাঁকিবাজ, ফেরেব-বাজ,
আপনারে আর দিস্নে লাজ,-
গরু ঘুষ দিয়ে চাস্ সওয়াব?
যদিই রে তুই গরুর সাথ
পার হয়ে যাস পুল্সেরাত,
কি দিবি মোহাম্মদে জওয়াব।


শুধাবেন যবে-ওরে কাফের,
কি করেছ তুমি ইসলামের?
ইসলামে দিয়ে জাহান্নম
আপনি এসেছ বেহেশ্ত্ ’পর-
পুণ্য-পিশাচ! স্বার্থপর!
দেখাস্নে মুখ, লাগে শরম!


গরুরে করিলে সেরাত পার,
সন্তানে দিলে নরক-নার!
মায়া-দোষে ছেলে গেল দোজখ।
কোরবানী দিলি গরু-ছাগল,
তাদেরই জীবন হ’ল সফল
পেয়েছে তাহারা বেহেশ্ত্-লোক!


শুধু আপনারে বাঁচায় যে,
মুসলিম নহে, ভন্ড সে!
ইসলাম বলে-বাঁচ সবাই!
দাও কোরবানী জান্ ও মাল,
বেহেশ্ত্ তোমার কর হালাল।
স্বার্থপরের বেহেশ্ত্ নাই।


ইসলামে তুমি দিয়ে কবর
মুসলিম ব’লে কর ফখর!
মোনাফেক তুমি সেরা বে-দীন!
ইসলামে যারা করে জবেহ্,
তুমি তাহাদেরি হও তাবে।
তুমি জুতো-বওয়া তারি অধীন।


নামাজ-রোজার শুধু ভড়ং,
ইয়া উয়া প’রে সেজেছ সং,
ত্যাগ নাই তোর এক ছিদাম!
কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা কর জড়,
ত্যাগের বেলাতে জড়সড়!
তোর নামাজের কি আছে দাম?


খেয়ে খেয়ে গোশ্ত্ রুটি তো খুব
হয়েছ খোদার খাসী বেকুব,
নিজেদের দাও কোরবানী।
বেঁচে যাবে তুমি, বাঁচিবে দ্বীন,
দাস ইসলাম হবে স্বাধীন,
গাহিছে কামাল এই গানই!

১০
বাঁচায়ে আপনা ছেলে-মেয়ে
জান্নাত্ পানে আছ্ চেয়ে
ভাবিছ সেরাত হবেই পার।
কেননা, দিয়েছ সাত জনের
তরে এক গরু! আর কি, ঢের!
সাতটি টাকায় গোনাহ্ কাবার!

১১
জান না কি তুমি, রে বেঈমান!
আল্লা সর্বশক্তিমান
দেখিছেন তোর সব কিছু?
জাব্বা-জোব্বা দিয়ে ধোঁকা
দিবি আল্লারে, ওরে বোকা!
কেয়ামতে হবে মাথা নীচু!

১২
ডুবে ইসলাম, আসে আঁধার!
ব্রাহিমের মত আবার
কোরবানী দাও প্রেয় বিভব!
“জবীহুল্লাহ্” ছেলেরা হোক,
যাক সব কিছু-সত্য রোক!
মা হাজেরা হোক মায়েরা সব।

১৩
খা’বে দেখেছিলেন ইব্রাহিম-
“দাও কোরবানী মহামহিম!”
তোরা যে দেখিস্ দিবালোকে
কি যে দুর্গতি ইসলামের!
পরীক্ষা নেন খোদা তোদের
হাববের সাথে বাজি রেখে!

১৪
যত দিন তোরা নিজেরা মেষ,
ভীরু দুর্বল, অধীন দেশ,-
আল্লার রাহে ততটা দিন
দিও না ক’ পশু কোরবানী,
বিফল হবে রে সবখানী!
(তুই) পশু চেয়ে যে রে অধম হীন!

১৫
মনের পশুরে কর জবাই,
পশুরাও বাঁচে, বাঁচে সবাই।
কশাই-এর আবার র্কোবানী!-
আমাদের নয়, তাদের ঈদ,
বীর-সুত যারা হ’ল শহীদ,
অমর যাদের বীরবাণী।

১৬
পশু কোরবানী দিস্ তখন
আজাদ-মুক্ত হবি যখন
জুলম-মুক্ত হবে রে দীন।-
কোরবানীর আজ এই যে খুন
শিখা হয়ে যেন জালে আগুন,
জালিমের যেন রাখে না চিন্!!
আমিন্ রাব্বিল্ আলামিন!
আমিন রাব্বিল্ আলামিন!!

পরিস্থিতি বদলায়নি, মনের পশুদের দাপট চলছে?

নজরুল ১৯২১-২৪ সালে যে প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে ‘শহীদী-ঈদ’ কবিতাটি লিখেছেন সেই প্রেক্ষাপটকি গত প্রায় একশ’ বছরে বদলেছে? মুসলিম দেশগুলো কি প্রকৃত প্রস্তাবে স্বাধীনতা পেয়েছে?

নাকি পুরনো সাম্রাজ্যবাদীরা আড়ালে গিয়ে নিজেদের তাবেদারদের দিয়ে মুসলিম দেশগুলোকে শাসন-শোষণ করছে?

শুধুই কি শাসন চলছে? গণতন্ত্রের মাধ্যমে ইসলামের আলোকে নিজেদের পছন্দমতো সাম্য ও ন্যায় বিচার  কায়েম করা থেকে মুসলমানদের বঞ্চিত করে দারিদ্র-নিপীড়ন-সন্ত্রাস চাপিয়ে দেওয়া হয়নি?

কারিগরি করে মুসলিম দেশে স্বৈরাচারী আর সন্ত্রাসীদের চাপিয়ে দিয়ে তাদের মধ্যে মেকি লড়াই বাধিয়ে বছরের পর বছর সাধারণ মুসলমানদের গণহত্যার মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। চারিদিকে ক্ষুধা, ধর্ষণ আর আর্তচিৎকার শোনা যাচ্ছে।

এমন প্রেক্ষাপটের মধ্যেই একদল মুসলমান আছে স্বজাতির প্রতি যাদের কোনও অনুভূতি নাই। স্বৈরাচার ও সন্ত্রাস থেকে তাদের মুক্তির জন্য কোনও পেরেশানি নেই এদের। এরা সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের তাগিদ বোধ করে না।

বরং এই নাফরমানের দল বিদ্যমানতার তাবেদারি করে নিজেদের কোরবানি নিয়ে প্রতারণা করছে। এরা বনের পশুকে জবাই করার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য নিজেদের জান-মাল কোরবানির তাগিদ আড়াল করছে। এইসব লোকেদের মনের পশু কোরবানিই আজ সময়ের সবচেয়ে বড় করণকর্তব্য।

পাঠক মন্তব্য () টি

বিএনপির শক্তি ও দুর্বলতা

শতাব্দীর মহীরুহ মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী জীবন সায়াহ্নে এসে তার আদর্শের পতাকা…

কার মনের পশু জবাই করতে হবে?

নজরুলের কথার বরাতে লোকজন বলছে গরু-ছাগল নয়, কোরবানি করতে হবে মনের পশু…

সেক্যুলারদের মুখে ধর্মের দোহাই যথেষ্ট নয়

প্রথম আলো সম্পাদক বলেছেন সেক্যুলার বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের হতাশাটা কতখানি।

কপিরাইট ২০১৪ onlineBangla.com.bd
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: গুলবুদ্দিন গালীব ইহসান
অনলাইন বাংলা, ৬৯/জি গ্রিন রোড, পান্থপথ (নীচ তলা), ঢাকা-১২০৫।
ফোন: ৯৬৪১১৯৫, মোবাইল: ০১৯১৩৭৮৯৮৯৯
ইমেইল: contact.onlinebangla@gmail.com
Developed By: Uranus BD