সর্বশেষ আপডেট ৪ ঘন্টা ৩৯ মিনিট আগে
আপনি আছেন হোম / মতামত / কলাম / চিটাগাং নাকি ডুবে যাবে

চিটাগাং নাকি ডুবে যাবে

প্রকাশিত: ২৯ জুন ২০১৭ ২৩:৩৩ টা | আপডেট: ৩০ জুন ২০১৭ ১২:৫৬ টা

জিয়া হাসানঃ

কয়েক দিন আগে আমার ছেলে প্রশ্ন করলো, বাবা চিটাগাং নাকি ডুবে যাবে?
আমি সাধারণত ওকে ক্রিটিকাল প্রশ্নে এঙ্কারেজ করি, কিন্ত ওর চোখে একটা সন্ত্রাস এবং ভীতি দেখতে পেলাম, যেইটা আমাকে নারভাস করে দিয়েছিল।
আমি বললাম, কে বলছে?
বললো, আম্মু বলছে।
আমি বললাম না, আম্মু ভুল বলছে।

সে সাধারণত এই ধরনের প্রশ্নে আমার উপরে আস্থা রাখে তাই সে খুশি হয়ে চলে গেলো।
কিন্ত তার প্রশ্নটা ঈদের ছুটিতে অনেক গুলো বন্ধু এবং আত্মিয় স্বজনের সাথে আলাপে বার বার আমার কানে বাজছে।

এবং তাদের সাথে আলাপে বার বার মনে হয়েছে, গ্লোবাল ওয়ারমিংয়ের ফলে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির এবং বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চল তলিয়ে যাওয়ার বিষয়টা এখন আর কোন ভবিষ্যতের সম্ভাবনা না সেই প্রক্রিয়া এখুনি শুরু হয়ে গ্যাছে। ক্লাইমেট চেঞ্জের কারণে যে মাইগ্রেশান সেইটা এখন চট্টগ্রাম শহরে চোখের সামনেই হচ্ছে। এবং যেসব ব্যবস্থা নিলে একে সামলানো যেত সেইগুলো না নেয়ার কারণে এবং অদক্ষতা এবং দুর্নীতির কারণে সমস্যাগুলো আরো জটিল হচ্ছে।

একজন বন্ধু জানাল চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ হালি-শহরের কিছু অঞ্চল এবং আগ্রাবাদের কিছু অঞ্চলে এখন জোয়ার ভাটার সাথে নিয়মিত পানি উঠে। এইগুলো আগেও ছিল, কিন্ত এখন এমন সব এলাকায় জোয়ার ভাটায় পানি উঠছে নামছে যা কয়েক বছর আগেও কেউ চিন্তা করেনি। যেমন এখন নাকি দেওয়ানবাজারের কিছু অঞ্চলেও জোয়ার ভাটা হচ্ছে- যেটা শুনে বিশ্বাস করতে পারি নাই।

চট্টগ্রাম শহরের কাছেই আনোয়ারা থেকে ঘুরে আসা এক বন্ধু জানালো সেখানেও এখন এমন সব এলাকায় জোয়ার ভাটায় পানি উঠছে যে আগে দেখা যায়নি।

সব চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে আছে বাংলাদেশের এক সময়ের বিজনেস সেন্টার খাতুনগঞ্জ।

খাতুনগঞ্জের বেশ কিছু এলাকায় নিয়মিত জোয়ারে পানি উঠে ভাটাতে নেমে যায়। যেইসব এলাকায় এক সময় মাল্টিন্যশনাল ব্যাংক ছিল, অনেক বড় বড় বিজনেসের ফার্ম ছিল তারা এখন সেখান থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছে। বিগত কয়েক বছর ধরেই এই প্রক্রিয়া চলছে, এই বছরে সেইটা আরো খারাপ হয়েছে।

এই সব এলাকার মানুষ- শহরাঞ্চলের মানুষ- এক সময়ের পরিষ্কার সমতলের মানুষ- এখন জোয়ার ভাটা হিসেব করে তাদের জীবন ধারণ এডজাস্ট করছেন।

ক্লাইমেট চেঞ্জের কারণে সাগরের উচ্চতা বৃদ্ধি না হলে, এই ধরনের সমতলে জোয়ার ভাটা হওয়ার কোনো কারণই থাকতে পারে না।

কারণ, এইগুলো অতি বৃষ্টি বা আটকে থাকা পানি না, এইগুলো জোয়ার ভাটার পানি যার একমাত্র ব্যাখ্যা হতে পাড়ে সাগর পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি। কিন্তু এইটা নিয়ে আমরা এখনো বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারিনি।

বাংলাদেশের একটা অংশের তলিয়ে যাওয়াটা এখনো ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা হিসেবে আলোচিত হচ্ছে কিন্তু সাগরের পানির উচ্চতার বৃদ্ধির প্রভাব যে এখুনি শুরু হয়েছে এবং আগামী আট দশ বিশ বা পঞ্চাশ পরে এই পানি আরো কত দূর আগাতে পারে এবং পানির উচ্চতা আরো বৃদ্ধি পেলে আর কোন কোন এলাকা ধীরে ধীরে জোয়ার ভাটার মধ্যে পড়বে সেই অঞ্চলগুলোকে আগে থেকে আইডেন্টিফাই করে কিভাবে এই দুর্যোগ মোকাবেলা করবো তা নিয়ে আমাদের রাষ্ট্রীয় লেভেলে এবং আইডেন্টিটি পলিটিক্সে ব্যস্ত সিভিল সোসাইটির কোন মাথা ব্যথা নাই।

বরং দুঃখজনক ভাবে সাগরের পানির উচ্চতা বৃদ্ধির এই প্রভাব মোকাবেলা করতে যেসব পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে, তা সমস্যাগুলোর সমাধান না করে- ভুল প্রযুক্তি, জ্ঞানের অভাব এবং দুর্নীতির কারণে মানুষের জীবনকে আরো দুর্বিসহ করে তুলছে।

একজাম্পল হিসেবে আমরা দেখতে পারি, আগ্রাবাদে সিডিএ কলোনির মহেশখালকে।

এই খালটা কিছুই নয়, সাগরের সাথে সংযুক্ত একটা খাল। যে খালের দুই পাড়ে যথেষ্ট সমৃদ্ধ একটা কলোনি এবং হাউজিং এলাকা গড়ে উঠেছে বিগত কয়েক দশকে যেখানে প্রায় পাঁচ লক্ষ লোকের বসবাস।

সাগরের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাস বা বিভিন্ন কারণে মহেশখালের পানি দুই কূলকে ছাপিয়ে যায় আজকে অনেক বছর ধরেই। এই পানি সাধারণত ভাটায় নেমে যায় এবং রাষ্ট্র কোন ব্যবস্থা না নেয়াতে এলাকার মানুষ ধীরে ধীরে এই জোয়ার ভাটার সাথে এডজাস্ট করে নেয়ার চেষ্টা করছে।

এই সমস্যা সমাধানের জন্যে, কর্তৃপক্ষ কী করলো? তারা মহেশখালের উপরে একটা বাঁধ দিয়ে দিলো। এবং এই বাঁধ দেয়ার ফলে কখনো যদি জোয়ারে বা অতিবৃষ্টিতে বা জলোচ্ছ্বাসে খালের ভেতরে এলাকায় পানি আটকে পরে সেই পানি পারমানেন্টলি রয়ে যায়, আর বের হতে পারেনা। এক সময়ে যেখানে জোয়ারের পরে ভাটার সময়ে পানি নেমে যেত এখন সেই পানি পারমানেন্টলি থেকে যাচ্ছে।

এই জন্যে এই এলাকার মানুষের ব্যাপক ভোগান্তির এবং বাধ না ভেঙ্গে ফেললে আন্দোলনের মুখে জুন মাসের শুরুতে মহেশখালের উপরের অস্থায়ি বাঁধটি ভেঙ্গে ফেলা হয়।

অন্যদিকে মহেশখালের বাঁধের ভাটির অঞ্চলের জনগণ সেইটার বিরোধিতা করেছে কারণ এর ফলে তাদের এলাকায় জলাবদ্ধতা বাড়বে।

অথচ কমন সেন্স বলে সামান্য স্লুইস গেট দিলেই হয়তো এই সমস্যাটা ঠেকানো যেত। তাতে জোয়ারের সময় স্লুইস গেট আটকে পানি ঠেকানো যেত এবং অতিবৃষ্টিতে ভেতরে পানি আটকে গেলে স্লুইস গেট খুলে পানি বের করে দেয়া যেত।

কিন্তু এই উন্নয়নমারানো রাষ্ট্র এতো বছরেও সেটা করতে পারেনি। এবং যে সামান্য মাটির অস্থায়ী বাঁধ তৈরি করতে ৪০ লক্ষ থেকে ৫০ লক্ষ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয় সেই বাঁধ তৈরি করতে বন্দরের ফান্ড থেকে সাড়ে তিন কোটি টাকার উপরে খরচ করে অস্থায়ী বাঁধ হয়েছে। এবং শোনা যাচ্ছে ঠিকাদার নিয়ে গ্যাছে আরো বেশি যাক শিউর না হয়ে বলতে চাই না, তাহলে আছে ৫৭ ধারার খড়গ।

তবুও আপনাদের নিজস্ব জাজমেন্টের জন্যে, মহেশখালের সদ্য অপসৃত সাড়ে তিন কোটি টাকার অস্থায়ী বাঁধের একটা ছবি দিলাম।

অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের ইমপ্যাক্ট সামলানোর জন্যে বাংলাদেশের জন্যে বিলিয়ন ডলারের বরাদ্দ ডোনারদের কাছে আছে। কিন্ত সেই টাকা নষ্ট করা হয়ছে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর আত্মিয় স্বজন এবং দলীয় পাণ্ডাদের মাধ্যমে গাছ লাগানোর প্রজেক্ট দিয়ে। তারা ভালো কোন প্রজেক্ট খুঁজে পায় নাই। সীমাহিন দুর্নীতির কারণে ক্লাইমেট ফান্ডের সেই টাকা ব্লক করে দেয়া হয়েছে।

আর এইটা শুধু টাকার প্রশ্ন না। চট্টগ্রামের মত একটা বর্ধিষ্ণু শহর এবং বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চল ক্লাইমেট চেঞ্জের ধাক্কা কিভাবে সামলাবে সেইটা নিয়ে, বৈশ্বিক জ্ঞানের সাথে আমাদের কানেক্ট করা প্রয়োজন। সেই গুলোর সাথে সংযোগে প্রক্রিয়া আমাদের আরো আগেই শুরু করা উচিত ছিল এবং এই নিয়ে বৈশ্বিক একটা সচেতনতা আছে যাকে আমরা সহজেই ব্যবহার করতে পারতাম। এই কাজগুলোর জন্যে ফান্ড, প্রযুক্তি এবং জ্ঞান সরবরাহ করতে বিশ্বের রাষ্ট্রীয়, আন্তর্জাতিক এবং বেসরকারি অনেক সংস্থা আছে, যাদের সাথে কানেক্টিভটি গড়ে তোলার কাজটা আমাদের এখুনি শুরু করা উচিত।

কিন্তু আমরা মেধাকে চাপা দিয়ে গারবেজকে পদোন্নতি দেয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে তুলেছি তাতে জনপ্রশাসন এই সামান্য কানেক্টিভটি তৈরি করার স্কিলটাও হারিয়ে ফেলেছে।

এই দক্ষতা এবং দুর্নীতির ভয়াবহ ফলাফল হবে এবং যার ইমপ্যাক্ট এখুনি পরতে শুরু হয়েছে।

হালিশহরের বেশ কিছু অঞ্চল থেকে অনেক পরিবার এবং খাতুনগঞ্জ থেকে অনেক ব্যবসায়ী ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছে।

এইটাই গ্লোবাল ওয়ারমিং এবং সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধি যা এখন খাতুনগঞ্জকে প্লাবিত করছে , দেওয়ানবাজারের মত অনেক দূরবর্তী জনবসতিতে এখন জোয়ার ভাটা দিয়ে পানি উঠছে।

এইটা ইরাভারসিবল এবং আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাহিরে তার কারণ গ্লোবাল গ্রিন হাউজ গ্যাসের কারণেই সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। কিন্ত এর ইমপ্যাক্টকে সামলে নিতে যে ব্যর্থতা, বৈশ্বিক জ্ঞানের সাথে কানেক্ট করার যে সামর্থ্যহীনতা এবং আমাদের জন্যে এভেলেবল ফান্ডকে কাজে লাগানোর যে ব্যর্থতা এবং এই দুর্নীতি- এইগুলো কিন্ত লোকাল।

যারা যারা মনে করছেন শুধু প্রান্তিক সীমানার মানুষ সাফার করবে, অথবা যারা মনে করছেন শুধু সাগর পারের মানুষ সাফার করবে তারা ভুল করছেন- কারণ এই ক্লাইমেট মাইগ্রেশান আগামি কয়েক দশকে এবং আমাদের জেনারেশনের জীবদ্দশার মধ্যেই এই দেশে একটা ভয়ংকর ক্রান্তিকাল নিয়ে আসবে।

জানি না আমার সন্তানদের বা তাদের সন্তানদের কী পরিণতি হবে। তাদেরকে যে পরিস্থিতিটির মধ্যে পড়তে হবে, তাতে কোন রকম মিথ্যা তাদের জীবনে কোন কমফোরট নিয়ে আসতে পারবে না- যদি না আমরা এখনি জলবায়ু পরিবর্তন এবং সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মোকাবেলায় জ্ঞান ভিত্তিক সঠিক পদক্ষেপ না নেই । এবং সেইটার জন্যে আমাদেরকে এখনি সমস্যাগুলোতে ফোকাস করতে হবে।

যদি আমরা সেইটা না করি, এবং আইডেন্টিটি পলিটিক্সের আফিম ও এই জঘন্য ডেভেলপমেন্ট জোচ্চুরির ন্যারেটিভ ঠেকে বের হয়ে এখনি যদি রাষ্ট্রের এবং নাগরিকের মূল ইস্যু গুলোতে ফোকাস না করি তবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনের সেই সব বিপর্যয়ের জন্যে আপনি আমিই দায়ী থাকবো।

জিয়া হাসান: লেখক ও বিশ্লেষক

পাঠক মন্তব্য () টি

আসামের ‘বাংলাদেশী বন্দিশিবিরগুলো’

আসামের বর্তমান ‘বাংলাদেশী বন্দিশিবিরগুলো’ কি ৭০ বছর আগের নাজি শিবিরগুলোর সঙ্গে তুলনীয়?

পরিস্থিতি কাতারের পক্ষে ঘুরে গেছে

মজলুমের পক্ষে দুনিয়াব্যাপী মুসলমান জনগোষ্ঠী দাঁড়িয়ে গেছে ও যাবে, যা অপ্রতিরোধ্য।

এক গেরিলার শেষকৃত্য শেষের অনিশ্চয়তা

কাপলাংকে ‘বাবা-কাপলাং’ বা ‘আংকেল কাপলাং’ হিসেবে শ্রদ্ধার সঙ্গে সম্বোধন করা হতো।

কপিরাইট ২০১৪ onlineBangla.com.bd
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: গুলবুদ্দিন গালীব ইহসান
অনলাইন বাংলা, ৬৯/জি গ্রিন রোড, পান্থপথ (নীচ তলা), ঢাকা-১২০৫।
ফোন: ৯৬৪১১৯৫, মোবাইল: ০১৯১৩৭৮৯৮৯৯
ইমেইল: contact.onlinebangla@gmail.com
Developed By: Uranus BD