সর্বশেষ আপডেট ৪ ঘন্টা ৪১ মিনিট আগে
আপনি আছেন হোম / মতামত / কলাম / আসামের ‘বাংলাদেশী বন্দিশিবিরগুলো’

আসামের ‘বাংলাদেশী বন্দিশিবিরগুলো’

প্রকাশিত: ২৯ জুন ২০১৭ ২৩:০০ টা | আপডেট: ৩০ জুন ২০১৭ ০০:৪৮ টা

আলতাফ পারভেজঃ

এক.
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে এবং যুদ্ধকালে নাজিরা অনেক কনসেনট্রেশন ক্যাম্প গড়ে তুলেছিল। প্রথম দিকে রাজনৈতিক ভিন্নমতালম্বীদের এবং পরে ধীরে ধীরে ‘অগ্রহণযোগ্য নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীগুলো’কে এগুলোয় রাখা হতো। ১৯৪৫ নাগাদ এসব ক্যাম্পে বন্দি মানুষের সংখ্যা সাত লাখ অতিক্রম করেছিল। কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের বাইরে নাজিরা গড়ে তুলেছিল ‘এক্সট্রামিনেশন ক্যাম্প’। কনসেনট্রেশন ক্যাম্পকে যদি বন্দিশিবির বলি, ‘এক্সট্রামিনেশন ক্যাম্প’কে বলতে হবে নির্মূল শিবির।

আসামের বর্তমান ‘বাংলাদেশী বন্দিশিবিরগুলো’ কী ৭০ বছর আগের নাজি শিবিরগুলোর সঙ্গে তুলনীয়? জানি সিরিয়াস ভিন্নমত থাকবে অনেকের। তবে স্পষ্টত খানিকটা নাজি মাইন্ডসেটের ছাপ আছে এতে।

আসামে এগুলোকে বাংলাদেশী বন্দিশিবির বলা হয় না-- বলা হয় ‘ডিটেনশন সেন্টার।’ তবে এগুলোতে ‘বিদেশী’ তথা বাংলাদেশী হিসেবে আটকৃতরাই থাকছেন। আর, এসব ডিটেনশন সেন্টার আসাম বা ভারতীয় প্রচারমাধ্যমে নিন্দিত কিছুও নয়। বরং এগুলোকে ‘রাজনৈতিক আন্দোলন’-এর ফসল হিসেবেই মনে করা হয়।

দুই.
আসাম দারিদ্র্য কবলিত একটি অঞ্চল (জনসংখ্যার ৩২ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নীচে) হলেও এখানকার শাসক এলিটদের একটি সফলতা হলো তারা রাজনীতির এজেন্ডা করে রেখেছেন মূলত ‘বিদেশী’ প্রশ্ন। অর্থাৎ কে আসামের নাগরিক আর কে ‘অবৈধ অভিবাসী’ এ নিয়েই আসাম প্রতিনিয়ত গলদর্ম। পুরো আসাম জুড়ে ‘বিদেশী’ ধরতে ৫০০টি পুলিশ টিম কাজ করছে বহুদিন থেকে। সবার টার্গেট বাংলাভাষীরা।

এসব কার্যক্রমেরই উত্তুঙ্গ এক মূহূর্তে ১৯৯৮ সালে ভোটার লিস্ট তৈরির সময় স্থানীয় অসমীয়দের চাপের মুখে প্রায় ৩ দশমিক ৭ লাখ বাংলাভাষীকে ‘ডি-ভোটার’ (ডাউটফুল ভোটার) করে দেয়া হয়। এদের অধিকাংশই ছিল বাঙ্গালি হিন্দু ও মুসলমান।

তবে বিষয়টি এখানেই থেমে থাকে নি।

‘ডি-ভোটার’দের বিষয় মীমাংসা করার জন্য এবং আসামে বিদেশী শনাক্ত করার জন্য এরপর আসাম জুড়ে প্রথমে ৩৬টি এবং পরে ১০০টি ট্রাইব্যুনাল বসানো হয়। ২০০৪ সালে গোহাটি হাইকোর্ট ভয়াবহ এক রায় দিয়ে বলে--এসব ট্রাইব্যুনালে যাদের নাগরিকত্ব নিয়ে মোকদ্দমা থাকবে তাদের ‘ডিটেনশন ক্যাম্পে’ রাখতে হবে। স্বাভাবিক জীবন যাপনে রাখা যাবে না তাদের।

যেহেতু আদালতের মাধ্যমে ডিটেনশন ক্যাম্পে’র যাত্রা--তাই ভারতে এবং আসামে প্রশাসনের জন্য বিষয়টি স্বস্তির ছিল; মানবাধিকার কর্মীদের তরফ থেকেও বেশি হৈচৈ হয়নি! জনশুমারিতে আসামে বাংলাভাষীদের সংখ্যাবৃদ্ধিও ডিটেনশন সেন্টারকে বিশেষ নৈতিক ভিত্তি দিয়েছে যেন!

তিন.
বর্তমানে আসাম জুড়ে এরূপ ক্যাম্প আছে ৬টি (কোকড়াঝাড়, শিলচর, দিব্রুগড়, জোরহাট, তেজপুর)। কারাগারগুলোর ভেতরই অস্থায়ীভিত্তিতে এসব ক্যাম্প খোলা হয়েছে। তবে সবাই ভাবছেন যেভাবে আসাম জুড়ে ‘বিদেশী’ প্রশ্ন রাজনীতিকে গ্রাস করে আছে, যেভাবে ‘ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল’-এ মামলা আসছে তাতে আরও অনেক বন্দিশিবির লাগবে। ইতিমধ্যে ২০ বিঘা জায়গার উপর স্থায়ী একটি ডিটেনশন সেন্টার গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে গোয়ালপাড়ায়--যা ভারতের মধ্যে এরূপ সবচেয়ে বড় সেন্টার হবে।

এদিকে, আসামে এখন বিজেপি ক্ষমতায়। তারা এসে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল ও ডিটেনশন সেন্টারগুলোকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। পূর্বে আসামে যাদেরই বিদেশী হিসেবে চিহ্নিত করা হতো তাদের মাঝে হিন্দু ও মুসলমান উভয়ই থাকতেন। মূলত বাংলাভাষী কিনা সেটা দেখা হতো। বিজেপি ঘোষণা করেছে, বিদেশী হলেও হিন্দুদের (খ্রিস্টান ও শিখদেরও) তারা নাগরিকত্ব দিয়ে দেবে। এলক্ষ্যে ফরেনার্স এক্ট সংশোধন করেছে তারা। ফলে আসামের ডিটেনশন সেন্টারগুলোতে এখন থাকতে হবে কেবল মুসলমানদের।

এসব ক্যাম্পকে সন্ত্রাস বিরোধী একটা ভাবমূর্তি দেয়ার জন্য একটি ক্যাম্পে ২৮ জন আফগান নাগরিককেও রাখা আছে। এইসব সেন্টারে একবার কাউকে রাখা গেলে তার জামিন বা আদালতে লড়াইয়ের জন্য বাইরে যাওয়ারও উপায় নেই। ২০১৬-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালগুলোতে ২,৬৯,৫২২টি মামলা এসেছে ‘ডি-ভোটার’দের।

চার.
আসাম ও বাংলাদেশের মধ্যে ২৮৪ কিলোমিটার সীমান্তের ২২৪ কিলোমিটারেই তারকাটা দেয়াল বসানো হয়ে গেছে। ৬০ কিলোমিটারে বসেছে ইসরায়েল থেকে আনা নন-ফিজিক্যাল সুরক্ষা ব্যবস্থা। উপরন্তু বিএসএফ-এর বাইরেও এই স্বল্প দূরত্বের সীমান্ত পাহারা দিতে সম্প্রতি ৪টি পুলিশ ব্যাটালিয়ন গড়ে তোলা হয়েছে। এমনকি বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী আসামের জেলাগুলো অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ থেকে তেমন উন্নতও নয়। তারপরও ভারতের প্রচার মাধ্যমে আসামের এসব ডিটেনশন সেন্টারের বন্দিদের ‘বাংলাদেশী নাগরিক’ হিসেবেই তুলে ধরা হয়। তাদের অফিসিয়াল ভাষ্য হলো--‘এই ডিটেনশন সেন্টারের বাসিন্দারা বাংলাদেশে ফেরত যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।’ যদিও আসাম সরকারেরই এক শ্বেতপত্রে স্বীকার করা হয়েছে-- ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে পরিচালিত মোকদ্দমাগুলোর ৯২ ভাগেই দেখা যাচ্ছে বিবাদিরা ‘ভারতীয় নাগরিক’ প্রমাণিত হচ্ছে। অর্থাৎ এই ভারতীয় নাগরিকরা শুধুই বাংলাভাষী হওয়ার কারণে ‘বিদেশী খেদাও’ আন্দোলনের শিকার হয়ে বহুবিদ হেনস্তা হচ্ছেন। যার সঙ্গে অনেকাংশেই তুলনা চলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন নাজি শিবিরগুলোর বাসিন্দাদের হেনস্তার সঙ্গে।

কিন্তু বাংলাদেশ-ভারত ‘সর্বোচ্চ বন্ধুত্বে’র এই সময়ে আপাতত সেই তুলনার অবকাশ কোথায়?

আলতাফ পারভেজ: সাবেক ছাত্রনেতা, গবেষক, লেখক, সাংবাদিক ও শিক্ষক

পাঠক মন্তব্য () টি

চিটাগাং নাকি ডুবে যাবে

চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ হালিশহরের এবং আগ্রাবাদের কিছু অঞ্চলে এখন নিয়মিত পানি উঠে।

পরিস্থিতি কাতারের পক্ষে ঘুরে গেছে

মজলুমের পক্ষে দুনিয়াব্যাপী মুসলমান জনগোষ্ঠী দাঁড়িয়ে গেছে ও যাবে, যা অপ্রতিরোধ্য।

এক গেরিলার শেষকৃত্য শেষের অনিশ্চয়তা

কাপলাংকে ‘বাবা-কাপলাং’ বা ‘আংকেল কাপলাং’ হিসেবে শ্রদ্ধার সঙ্গে সম্বোধন করা হতো।

কপিরাইট ২০১৪ onlineBangla.com.bd
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: গুলবুদ্দিন গালীব ইহসান
অনলাইন বাংলা, ৬৯/জি গ্রিন রোড, পান্থপথ (নীচ তলা), ঢাকা-১২০৫।
ফোন: ৯৬৪১১৯৫, মোবাইল: ০১৯১৩৭৮৯৮৯৯
ইমেইল: contact.onlinebangla@gmail.com
Developed By: Uranus BD