সর্বশেষ আপডেট ১১ ঘন্টা ২৭ মিনিট আগে
আপনি আছেন হোম / ফিচার / আধ্যাত্মিকতা / রমজানে নিয়মিত রোজা রাখে এ হিন্দু পরিবার

রমজানে নিয়মিত রোজা রাখে এ হিন্দু পরিবার

প্রকাশিত: ০৮ জুন ২০১৭ ১১:৫৪ টা | আপডেট: ০৮ জুন ২০১৭ ১২:০৯ টা

ফিচার ডেস্ক, অনলাইন বাংলাঃ

বারাসতের অদূরে ভাঙাচোরা এক মসজিদকে নতুন প্রাণ দিয়েছে দাঙ্গার শিকার এক হিন্দু পরিবার। রমজানে আজও তারা নিয়মিত রোজা রাখেন।

মাস দেড়েক আগে জ্যাঠার ইন্তেকালে নিয়মমত ন্যাড়া হয়েছিলেন তিনি। এখন ছোট ছোট চুল উঁকি দিচ্ছে। বড়সড় একটা রুমাল মাথায় বেঁধে মসজিদের ছাদে রোজাদারদের কাতারে ইফতারে বসলেন পার্থ।

চল্লিশ বছরের এ যুবাকে ঠাট্টা করতে ছাড়ে না বন্ধুরা। মজা করে ডাকে, ‘মোহাম্মদ’ পার্থসারথি বসু! পার্থ তাতে কিছু মনে করেন না। তার মন পড়ে থাকে- দিনভর রোজা শেষে আল্লাহকে ইমাম সাহেব কখন শোকরিয়া জানিয়ে মোনাজাত করবেন এবং মোবাইলের ঘড়িয়ে সময় মিলিয়ে খেজুর-কলা মুখে দিয়ে ইফতার করবেন।

বারাসত ডাকবাংলোর মোড় থেকে সর্বোচ্চ ১০ মিনিটের পথ। আশপাশে এক ঘর মুসলিম পরিবারেরও বসবাস নেই এখানে। কয়েক কিলোমিটার দূরে মধ্যমগ্রামের কোঁড়া, চন্দনপুর, কাটুরিয়া বা মছপুল থেকে আসেন রোজাদারের দল। বারাসত-হৃদয়পুর রুটের অটোচালক আবু হোসেন মণ্ডল, সবজিবিক্রেতা আশরাব আলী বা ঝকঝকে কলেজপড়ুয়া আজ্জু ওরফে শেখ আজহার উদ্দিনদের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, পাড়ার ডাক্তার মনোতোষ মিস্ত্রি বা রেল কর্মকর্তা আশীষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের।

মসজিদের পাশে চলতে ফিরতে শ্রদ্ধায় কপালে হাত ঠেকান অমুসলিমরা। কিংবা পুরোন বাদামগাছের বাঁধানো পিড়িতে মোমবাতি জ্বেলে দিয়ে যান। ইফতারের আগে রাস্তার কল থেকে পানি ভরে দেওয়াতেও হাত লাগান কেউ কেউ। মসজিদের পাশেই আম-লিচুর বড় বাগাগে অবশ্য দেবী দুর্গার পূজা হয়। তবে এতে নিয়মিত জুমার জমায়েত, মসজিদের ছাদের ইফতার, রমজানের তারাবির নামাজ বা কোরান তেলাওয়াতে কখনও বাধা পড়েনি।

বারাসতে পশ্চিম ইছাপুর নবপল্লীর এই মসজিদই ধ্যানজ্ঞান বোসবাড়ির ছেলের। এখানে ২০-২৫ বিঘা জমি জুড়ে বোসদের সম্পত্তি। আজকের প্রবীণ দীপক বসু কালীপুজায় বাড়িতে উপোস করেন। কিন্তু এই ৬৭ বছরেও রোজ সকাল-বিকাল মসজিদে হাজির হওয়া চাই। সকাল সাতটায় নিজের হাতে মসজিদের মেঝে ঝাড়ু দিলেই তবে তার শান্তি। এই বয়সে নিজে রোজা রাখতে পারেন না। কিন্তু তার ছেলে পার্থ ওরফে ‘বাপ্পা’র ফাঁকি দেয়ার সুযোগ নেই।

‘ওরা সারা দিন পানি স্পর্শ না-করে আছে, আমি কী করে খাই!’ ভাবতে ভাবতে কয়েক বছর হল পার্থও রোজা রাখতে শুরু করেছেন। স্বামীর ইচ্ছাকে মর্যাদা দিতে ভোররাতে সেহরির আগে চা-রুটি করে দিতে রাত দুইটায় ঘুম থেকে উঠছেন পার্থর স্ত্রী পাপিয়া। গত বছর রমজানে ব্যবসার কাজে বেশ কিছু দিন হৃষিকেশে ছিলেন পার্থ। পবিত্র হিন্দু তীর্থেও রোজার রুটিনে নড়চড় হয়নি।

বারাসতে দেশান্তরী খুলনার বসু পরিবার অবশ্য কল্পনাও করেনি, তাদের ভাগ্যের সঙ্গে এ ভাবে জড়িয়ে যাবে একটি মসজিদ।

’৬৪ সালে দাঙ্গার আগে কোনও দিন ‘ইন্ডিয়ায় চলে আসবেন’ ভাবেনইনি কেউ। পার্থর দাদা প্রয়াত নীরদকৃষ্ণ বসু পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আয়ুব খানের কাছ থেকে ‘খিদমত-ই-পাকিস্তান’ খেতাব পেয়েছিলেন। চট্টগ্রাম বন্দরের গেজেটেড অফিসার ছিলেন তিনি।

খুলনার ফুলতলার আলকাগ্রামে বাড়ি ছিল বোসদের। মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকারদের হাত থেকে প্রাণ বাঁচতে টানা ১১ দিন পুকুরে লুকিয়ে ছিলেন বোস পরিবারের ছেলে মৃণালকান্তি। নীরদকৃষ্ণের সেজো ছেলে নারায়ণকৃষ্ণকে রাজাকাররা ধরে নিয়ে গেলে তার স্ত্রী গৌরী আত্মহত্যা করেন। এরপর নীরদকৃষ্ণ ও তার ভাই বিনোদবিহারীর সন্তানেরা ভারতের বারাসতের ওয়াজুদ্দিন মোড়লের সঙ্গে সম্পত্তি বদল করে বিদেশে চলে যান।

ভারতে আসার পর তাদের খেয়াল হয় ওয়াজুদ্দিন মোড়লের জমিতে একটি মসজিদও রয়েছে। তিন কাঠা জমিতে গড়ে তোলঅ মসজিদটি ছিল পুরাতন আমলের। এ কারণে মসজিদে কারও যাতায়াতও ছিল না। কিন্তু বাদামগাছের ধারের মসজিদে ভক্তি ভরে বাতি জ্বেলে আলোর ব্যবস্থা করেন নীরদকৃষ্ণের স্ত্রী লীলাবতী। তিনি ছেলেদের ওসিয়ত করে যান যেন মসজিদে কখনো আলোর অভাব না হয়।

এরপর মসজিদটির সংস্কার করা হয়। মসজিদটির নাম রাখা হয় ‘আমানতী মসজিদ’। এর কারণ হলো বসু পরিবার চট্টগ্রামের ওলি হযরত আমানত আলী শাহের মুরিদ। তার নামেই রাখা হয়েছে মসজিদের নাম।

বসুদের পারিবারিক সংস্কৃতিতেও বড় জায়গা করে নিয়েছে আমানতী মসজিদ। তাদের কেউ মারা গেলে, তাকে মসজিদে নিয়ে আসা হয়। মসজিদের ইমান আজান দেয়ার পরেই মরদেহ শ্মশানে নিয়ে পোড়ানো হয়। এ বাড়ির কোনো ছেলে বিয়ে করলে নববধূকে শ্বশুরবাড়ি প্রবেশের আগে মসজিদে গিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে হয়। আর নবজাতকের আগমনে অন্নপ্রাশনের পরিবর্তে মসজিদের ইমাম সাহেবের হাতে মুখে পায়েশ দেওয়াই রীতি।

পঁচিশ বছর আগে যখন সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীরা অযোধ্যার বাবরী মসজিদে হামলা করেছিল তখন পার্থ এবং তার জেঠাতো ভাইয়েরা সন্ধ্যায় দল বেঁধে আমানতী মসজিদ পাহারা দিয়েছিলেন। মুরব্বিরা নির্দেশ ছিল এ মসজিদে যেন কোনও সাম্প্রদায়িক হামলা না হয়।

হামলাও হয়নি। কারণ পাড়াপড়শিরা সবাই বিশ্বাস করেন এই মসজিদের কারণে তারা বালামুসিবত থেকে হেফাজতে থাকেন। দীপক বুস কেরোসিনের ডিলার। ব্যাংকে কিছু টাকা আয়ের বেশির ভাগই মসজিদের যত্নের জন্য খরচ করেন। এ বাড়িরই ছেলে বোম্বাইয়ের প্রয়াত চিত্রপরিচালক দিলীপকুমার বসু। চাচাতো ভাইরা মিলে মসজিদের সংস্কার করেছেন। ইমাম, মুয়াজ্জিন নিয়োগ করেছেন।

মসজিদের খরচ বসু পরিবার নিজেরাই যোগায়। এ মসজিদে নগদ অনুদান গ্রহণের নিয়ম নেই। একটি প্রভাবশালী ধর্মীয় সংগঠন একবার মসজিদের দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব দিলেও তাতে রাজি হননি তারা।

রমজানে এ মসজিদে ইফতার করা নিয়ে কাউকে রাজনীতি করতে দেয়া হয় না। ইফতারের সময় তবু খুশির ঝিলিক বয়ে যায়। প্রতি সন্ধ্যারাতে তারাবারি নামাজে ইমামের কুরআন তেলাওয়াতের আসরে মুসলমানদের পাশাপাশি হিন্দুরাও হাজির হন। পার্থ বলেন, ‘আমরা মানি, কুরআন কিন্তু শুধু মুসলিম নয়, সবার পড়ার জন্য!’

শবে কদরের দিন (সাতাশ রোজা)  খতম তারাবারি সম্পূর্ণ হলে সাধ্যমত চাঁদা তুলে পাড়ার সবাইকে দাওয়াত খাওয়ান রোজাদাররা।

সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা, ভাষা ও বানানরীতি নিজস্ব

পাঠক মন্তব্য () টি

পবিত্র আশুরা আজ

'নীল সিয়া আসমান, লালে লাল দুনিয়া/আম্মাগো লাল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া/কাঁদে কোন…

হজের নতুন খতিব শায়খ ড. সাআদ বিন আন নসর

বুধবার থেকে পবিত্র হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার ফজরের নামাজ আদায়ের পর…

আজ পবিত্র হজ

আজ পবিত্র হজ। 'লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা…

কপিরাইট ২০১৪ onlineBangla.com.bd
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: গুলবুদ্দিন গালীব ইহসান
অনলাইন বাংলা, ৬৯/জি গ্রিন রোড, পান্থপথ (নীচ তলা), ঢাকা-১২০৫।
ফোন: ৯৬৪১১৯৫, মোবাইল: ০১৯১৩৭৮৯৮৯৯
ইমেইল: contact.onlinebangla@gmail.com
Developed By: Uranus BD