সর্বশেষ আপডেট ১৩ ঘন্টা ৩৭ মিনিট আগে
আপনি আছেন হোম / মতামত / কলাম / চীনকে ব্রেটনউড সিস্টেমের চেয়েও উত্তম হতে হবে

চীনকে ব্রেটনউড সিস্টেমের চেয়েও উত্তম হতে হবে

প্রকাশিত: ০৬ জুন ২০১৭ ১০:১৫ টা | আপডেট: ০৬ জুন ২০১৭ ১০:৫৯ টা

গৌতম দাসঃ

চীন ২০১৪ সালে এআইআইবি ব্যাংক গঠনের প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু করেছিল। এআইআইবি ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সমতুল্য, তবে চীনা নেতৃত্বের অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক। ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে চালু হয়ে এটা কর্মতৎপরতা বাড়িয়েই চলেছে। এর প্রস্তুতিকালে আমেরিকা তার প্রভাবাধীন ঘনিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলো যেন এই ব্যাংকে যোগ না দেয় তা নিয়ে তৎপরতা চালিয়েছিল। প্রকাশ্য বক্তব্যে যে আপত্তি সে তুলেছিল, তা মনে রাখার মতো। বলেছিল, আমেরিকার নেতৃত্ব বিশ্বব্যবস্থা গড়তে গিয়ে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংককে যে স্ট্যান্ডার্ড, স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার সংগঠনের হিসাবে জন্ম দিয়েছে, তার সমমানের প্রতিষ্ঠান গড়তে চীন ব্যর্থ হবে বলেই আমেরিকা উদ্বিগ্ন। আর এই ‘কথা’ আমেরিকা তার এশিয়ান পার্টনার ও ঘনিষ্ঠ মিত্রদের জানিয়েছিল- যেটাকে আমেরিকার নেতিবাচক প্রচারণা বলা হয়েছিল সে সময়। চীনের এআইআইবি ব্যাংকের উত্থান এই প্রচারণা দিয়ে আটকে দেয়া যায়নি। বরং শুরু থেকেই এই স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখার বিষয়টাকে ইতিবাচকভাবে তারা এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিল। আজ ৭৭ রাষ্ট্রের সদস্যপদ হাসিল করে এআইআইবি নিজের তৎপরতার বিস্তার ঘটিয়ে চলছে। তা সত্ত্বেও এখানকার মূল কথা হলো গ্লোবাল অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের স্ট্যান্ডার্ড, তার স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা ইত্যাদি।

গত ১৪-১৫ মে বেইজিংয়ে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। সেখানেও একই কথা উঠেছিল। এই মেগা অবকাঠামো প্রকল্প ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের, যেখানে ৬৮ রাষ্ট্র সম্পৃক্ত হবে। সেখানে অংশগ্রহণকারীদের যৌথ ঘোষণার এক অংশ নিয়ে আপত্তি তুলেছিল ইউরোপের নেতা রাষ্ট্রগুলো। তাদের সার কথা হলো, অর্থসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ার কালে ওর মান, তার স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা ইত্যাদি কী হবে? শেষ মুহূর্তে আমেরিকা প্রতিনিধি পাঠিয়ে এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিল। আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, জাতিসঙ্ঘ- এদের প্রধান নির্বাহী এবং প্রায় ৩০টি সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান এতে যোগ দিয়েছিলেন। ভারত ছাড়া প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতির রাষ্ট্র সেখানে প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল।

স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার স্ট্যান্ডার্ড কথাটা ভেঙে বললে দাঁড়ায়, বড় অর্থ বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো প্রকল্প, এর মালিক খোদ রাষ্ট্র মানে সে দেশের জনগণ। ফলে প্রকল্পের মোট খরচ কত, তা ন্যায্য কিনা, প্রকল্পের খরচ অনুমোদনের পর তা দ্বিগুণ থেকে ছয় গুণ করে নেয়া হয়েছে কিনা, কাজের মান পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা আদৌ ছিল কিনা, প্রকল্পে দুর্নীতিরোধের কোনো ‘সেলফ চেক’ ব্যবস্থা ছিল কিনা- এ সংক্রান্ত স্বচ্ছ তথ্য চাওয়ামাত্র তো বটেই, না চাইলেও জনগণের দেখতে দেয়ার ব্যবস্থা ছিল কিনা, ‘পরিবেশ ধ্বংস করা কোনো উপাদান এই প্রকল্পে নাই’, এমন আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড ও দেশী পরিবেশ ছাড়পত্র ছিল কিনা, কাজ প্রদানে সবস্তরে স্বচ্ছ টেন্ডার ব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়েছিল কিনা ইত্যাদি বুঝানো হয়েছে।

বিগত প্রায় পাঁচ শ’ বছরের বিশ্ব ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থাকে মোটা দাগে তিনটি স্তর বা পর্যায়ে ভাগ করা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিকে একটা ল্যান্ড মার্ক ধরে বলা যায়, এর আগে ছিল এক কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজম। মানে আমাদের মতো দেশগুলোকে উপনিবেশীপন্থায় দখল করে এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থা কায়েম করে রাখা হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এই ব্যবস্থাটাই ভেঙে যায়, আর কায়েম হয় আমেরিকার নেতৃত্বে এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা। কলোনিয়াল ব্যবস্থা, কোনো গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল না। আমেরিকার নেতৃত্বের নতুন ব্যবস্থাটা গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের অধীন করে সাজানো।

আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের জন্ম হয়েছিল ১৯৪৪ সালের ১-২২ জুলাই; টানা ২২ দিন এক হোটেলে ৭৩০ ডেলিগেটের সভা ও বিতর্কের ভেতর দিয়ে আমেরিকার হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটনউড শহরে। তাই এদের ব্রেটনউড প্রতিষ্ঠানও বলে অনেকে। এখানে প্রথম পর্যায়ের কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমের পরের দ্বিতীয় পর্যায়কে ব্রেটনউড সিস্টেমের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম বলে চেনাব, সংক্ষেপে ব্রেটনউড সিস্টেম বলব।

কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমে এ ধরনের গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান ছিল না। এমনকি ‘কলোনি মাস্টার’ যেমন খোদ ব্রিটিশ রাষ্ট্রও খুব নিয়ন্ত্রণ করত না। বরং ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির মতো ট্রেডিং বা মেরিটাইম কোম্পানি, এদের নেতৃত্বে অন্য সব কোম্পানির এক সমাহার ছিল; রাষ্ট্র সেখানে ঠিক নিয়ন্ত্রক নয় সমন্বয়ের প্রতিষ্ঠান। কথাগুলো বোঝা যাবে, যদি মনে রাখি কেন্দ্রীয় ব্যাংক (রিজার্ভ ব্যাংক) ধারণাটা। কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটিও ছিল না। ব্রেটনউড সিস্টেমের সাথে আসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারণাটা। মানে রাষ্ট্র মোটা দাগে আগাম কিছু আইনি কাঠামো তৈরি করে দিয়েছে, সেগুলোর অধীনে স্বশাসিত। সেই আইনি সীমার মধ্যে এই ব্যাংক স্বশাসিতই শুধু নয়, রাষ্ট্রের মধ্যে তৎপর অন্য সব সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের সব কর্মতৎপরতার নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান সে। ব্যাংক ব্যবসা করার নীতি ঘোষণা করা, মনিটরিং এবং অবশ্য পালনীয় নির্দেশ দেয়ার প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অন্য দিকে সরকারের মুদ্রানীতি, ফিসক্যাল (অর্থ সরবরাহ ব্যবস্থা) নীতি হাজির করা ও নিয়ন্ত্রণ করার প্রতিষ্ঠানও এটা। মুদ্রা ছাপানোর কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। এগুলো সবই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ভূমিকা। এসবের বাইরে আইএমএফের নির্দেশ পালনের দায়িত্বের প্রতিষ্ঠান হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বলা হয় যেন আইএমএফের ডানা বা এক্সটেন্ডেড উইং হলো বিভিন্ন রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো। কোনো রাষ্ট্রের আইএমএফের সদস্যপদ পাওয়ার পূর্বশর্ত হলো, ওই রাষ্ট্রের এর আগে একটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থাকতে হবে। তাই বেশির ভাগ রাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্ম ১৯৪০ এর দশকে। ব্যতিক্রম কোথাও যদি থাকে তবে তা ভিন্ন কারণে। যেমন আমেরিকার ফেড বা ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক। আমেরিকার উদীয়মান ও বিকাশমান সব রাজ্যে আগে আলাদা স্বাধীন মুদ্রা ও অর্থ ব্যবস্থা ছিল। পরে সব ব্যবস্থার সমন্বয়ে এক অভিন্ন, ফেডারেল ব্যবস্থায় যাওয়ার জন্য (যেমন কমন কারেন্সি চালুর জন্য) ১৯১৩ সালে ফেডের জন্ম হয়েছিল। ব্যাংক অব ইংল্যান্ড ১৬৯৪ সাল থেকেই ব্যক্তিগত শেয়ারহোল্ডারদের ব্যাংক। কিন্তু এই ব্যাংকই ব্রিটিশ সরকারের আয়-ব্যয়ের অ্যাকাউন্ট ধারণকারী ব্যাংক। একটা বড় করপোরেশনের মতোই ব্রিটিশ সরকার তার একটা ক্লায়েন্ট। আবার সরকারের অনুমতিধারী একমাত্র মুদ্রা ছাপানোর ব্যাংক এটাই। এভাবেই প্রাইভেট ব্যাংক হিসেবে চলার পর ১৯৪৬ সালে এই ব্যাংকের জাতীয়করণ হয়, আর ব্রিটিশ সরকারের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে আবির্ভূত হয়।

কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমে ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক’ ছিল না, মানে রাষ্ট্রের মুদ্রা ও অর্থ ব্যবস্থা বলে কিছু ছিল না। এই সীমিত অর্থে ওই ক্যাপিটালিজম ব্যবসায়ীদের হাতে নিয়ন্ত্রিত হতো। এ ছাড়া অনেকেই জানেন, আন্তঃরাষ্ট্রীয় মুদ্রা বিনিময় হার- এটাও প্রাইভেট ব্যাংক বিশ্বস্ততার সাথে ঠিক করত। এ কাজের একচেটিয়া কারবারি, রথশিল্ড ব্যাংকিং পরিবারের কথা অনেকেই জানেন। আমাদের অনেকের ধারণা, স্ট্যান্ডার্ড বা স্বচ্ছতা বাস্তবায়নের ব্যাপারটা সরকার ছাড়া হয় না, হবে না। এই ধারণাটা বাস্তব নয়। কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমের যুগে স্বাধীন মুদ্রা ও অর্থ ব্যবস্থাটা দাঁড়িয়েছিল বেসরকারিভাবে, ব্যবসায়ীদের সমিতি ইত্যাদির নিয়ন্ত্রণে এবং একটা স্ট্যান্ডার্ড বা স্বচ্ছতার মান নিশ্চিত করে।

কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমের যুগ শেষে তা ভেঙে কায়েম হয় আমেরিকার নেতৃত্বে নতুন ব্যবস্থা- এই প্রথম গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থা; এক গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিকতায় আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের অধীনে গড়া নিয়ন্ত্রিত এক ব্যবস্থা। এটা পরিচালিত হয় সব সদস্য রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক- আইএমএফের এই ‘ডানা’গুলোর মাধ্যমে। এই অর্থে ‘পড়ে পাওয়া’ সুবিধা হলো রাষ্ট্র ব্যাংক ব্যবসার ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণের যুগের সূচনা করেছিল।

আমেরিকাসহ ইউরোপ আজ স্ট্যান্ডার্ড, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কথা তুলছে। তা ব্রেটনউড সিস্টেমের প্রতিষ্ঠানে আসতে সময় লেগেছিল ৫৬ বছর, ২০০১ সালে। মাত্র চলতি শতকে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে শক্তিশালী ও স্বাধীন ইন্টিগ্রিটি বিভাগ চালু করা হয়েছে। একজন ভাইস প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে আলাদা এই বিভাগ সরাসরি কেবল বোর্ডের কাছে রিপোর্ট ও জবাবদিহি করতে বাধ্য। কোনো কান্ট্রি অফিসকে কিছু না জানিয়েই সে তার কাজ করতে পারে। তবে এসব কথা শুনে এই বিভাগ বা বিশ্বব্যাংককে ‘সততার দেবতা’ মনে করার কোনো কারণ নেই, তা ভুল হবে। রক্ত মাংসের ও স্বার্থের এই দুনিয়ায় মানুষ যে মানের সবচেয়ে ভালো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে দেখাতে পেরেছে এর এক উদাহরণ বলা যায় এই বিভাগকে। আগে একটা কথা বলা দরকার।

বিশ্বব্যাংকের কাজ দেয়ার টেন্ডার পদ্ধতি খারাপ নয়, এটা বলতেই হবে। কোনো প্রকল্পে বিশ্বব্যাংককে ফান্ডদাতা হয় যে সরকার; ধরা যাক, একটা প্রকল্পে এর অর্ধেকের বেশি ফান্ড জাপান সরকারের। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই প্রকল্প নির্মাণের কাজ জাপানের কোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পায়নিই। মানে ফান্ডদাতা হলে কাজ তাকেই দিতে হবে, এমন কথা নেই। টেন্ডার আলাদা স্বাধীন পদ্ধতি ও ব্যবস্থা। যমুনা সেতুতে নদীশাসন কাজ পেয়েছিল নেদারল্যান্ড, দুই কানেকটিং রোড আর মূল ব্রিজ নির্মাণকাজ পেয়েছিল দুই কোরিয়ান কোম্পানি, আর কন্সালটেন্সি পেয়েছিল ব্রিটিশ কোম্পানি। তবে টেন্ডার অথবা বিশ্বব্যাংকের ভেতরের প্রসেসিংয়ের জন্য তারা একেবারে ‘আদর্শের অবতার’, এমন বলা এখানে উদ্দেশ্য নয়। আবার সেতু নির্মাণে কোনো দুর্নীতিই ছিল না, এমন অ্যাবসলিউট কোনো কথা বলা হচ্ছে না। তবে অন্তত তুলনামূলক অর্থে ফান্ডদাতা আর কাজ পাওয়াকে আলাদা করে ফেলতে পারা কম অগ্রগতি নয়। আর বিশ্বব্যাংক এটা ২০০১ সালে ইন্টিগ্রিটি বিভাগ খোলার আগেই করতে পেরেছিল। আবার বলে রাখা ভালো, অর্থের অপচয় আর দুর্নীতির (মানে স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার অভাব) দিক থেকে সত্তরের দশকের বিশ্বব্যাংক ছিল সবচেয়ে খারাপ উদাহরণ। সব মিলিয়ে বলা যায়, ব্রেটনউডস সিস্টেম এতটুকু পেরেছে, যা খারাপ অর্জন নয়।

পাঁচ শ’ বছরের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থার তৃতীয় পর্যায় মোটা দাগে এই শতকের শুরু থেকে বলা যায়। আমেরিকার জায়গায় চীনের নেতৃত্বে নতুন এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ধীরে ধীরে জায়গা করতে নেয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমেরিকার সরকারি স্টাডি ও নানা গবেষণাতেও এর স্বীকৃতি আছে। ব্রেটনউডস সিস্টেম বা দ্বিতীয় পর্যায়টা কায়েম হতে, একটা ওলটপালট আসতে একটা বিশ্বযুদ্ধের দরকার হয়েছিল। তৃতীয় পর্যায়ে যেতেও একটা বিশ্বযুদ্ধ দরকার, অনেকে অনুমানে তা বলে। কিন্তু এখনো তা স্পষ্ট হয়ে যায়নি। সর্বশেষ ট্রাম্পের আগমন আর হম্বিতম্বিকে চীনের একেবারে ঠাণ্ডা মাথায় মোকাবেলা এবং আমেরিকার জন্য জায়গা করে দেয়া যুদ্ধের শঙ্কা আপাতত নাকচ করেছে। কিন্তু এই লেখার মূল প্রশ্ন, একালে তৃতীয় পর্যায়ে, চীনের তৈরি গ্লোবাল প্রভাব নিয়ে জন্ম নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন- এআইআইবি, ব্রিক ব্যাংক, আরআইবি ইত্যাদি স্ট্যান্ডার্ড বা স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার মান কী হবে? এক কথায় বললে গ্লোবাল ব্যবস্থার তৃতীয় পর্যায়ের স্ট্যান্ডার্ড প্রতিষ্ঠান হতে গেলে এগুলোকে অবশ্যই ব্রেটনউডস সিস্টেমের চেয়েও ভালো, মানে যেমন বিশ্বব্যাংকের চেয়েও ভালো মান দেখাতেই হবে।

তবে এ কথা ঠিক, চীনের উত্থানে রেষারেষি প্রতিযোগিতায় পশ্চিমের স্বার্থটাকে মাখিয়ে তারা উপস্থাপন করে। তাই আমেরিকা বা ইউরোপের স্ট্যান্ডার্ডের প্রসঙ্গ তুলে চীনকে নাকচ করায় আমাদের মতো দেশের লাভ নেই। যেমন বাংলাদেশের সাথে চীনের রেল-রোড উদ্যোগসহ সব অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প আমাদের জন্য খুবই দরকারি। কিন্তু লক্ষণীয় যে, আমরা এখন টেন্ডার আহ্বানবিহীন সরকার, আর যেকোনো প্রকল্প ব্যয় দুই থেকে ছয় গুণ ব্যয় বাড়ানোর সরকারে পরিণত হয়েছিল। বাংলাদেশের স্বার্থের কথা বাদ দিলেও এটা চীনের জন্য বিশেষ করে আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড বা স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার মান- এই বিচারে খুবই খারাপ উদাহরণ। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থার দিক থেকে এই ব্যবস্থা অগ্রহণযোগ্য। এদিকটায় চীনেরও মনোযোগ দেয়া দরকার।

চীনের হয়তো পাল্টা বলার বিষয় হবে যে, বাংলাদেশের জনগণ যদি একটি অপ্রতিনিধিত্বশীল সরকারব্যবস্থাকেই টিকিয়ে রাখে, তাহলে সেটা ভালো না হওয়া পর্যন্ত চীন হাতগুটিয়ে বসে থাকলে এর সুবিধা প্রতিদ্বন্দ্বীরা নেবে। তবে এটাও ভালো যুক্তি নয়। কারণ এর চেয়েও দুর্নীতিবাজ সরকারের সাথে ও আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংককে কাজ করতে হয়েছে। তার পরও তাদের অর্জন খারাপ নয়। আমাদের মতো দেশে সরকারের কার্যকারিতা যতটুকু, এর দক্ষতা যতটুকু, তা তো আপন কোনো রাজনৈতিক সরকারের কারণে হয়নি, আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংক শর্ত দিয়ে তাদের বাধ্য করেছে বলা হয়েছে। যদিও শর্তের খারাপ দিক আছে, তা মেনেও এ কথা বলা যায়। যেমন শেখ মুজিবের আমলের রেশনব্যবস্থা। বিশ্বব্যাংকের শর্তের কারণে আগের ব্যবস্থা তুলে দিয়ে ঠিক রেশন নয়, তবে বাজারের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ অন্যভাবে কার্যকর আছে এবং আগের দরে বাজারে চাল ছেড়ে দেয়া- এটা খুব কার্যকর ব্যবস্থা।

মোট কথা, আমরা ব্রেটনউডস সিস্টেমের যুগ পার হয়ে এসেছি- এ কথা চীনকে মনে রেখে আগাতে হবে। আমাদের নতুন আকাক্সক্ষা পূরণ না করে, আমাদের হতাশ করে চীনের তৃতীয় পর্যায় গড়ে তোলা বা এর নেতা হওয়া অসম্ভব। চীনই ফান্ডদাতা, আবার কোনো টেন্ডার সিস্টেম নেই, কাজ পাবে কেবল চীন- এই ‘জি টু জি’, লোকাল এজেন্টের নামে ঘুষের ব্যবস্থা, প্রকল্পের অর্থ ছয় গুণ বাড়িয়ে নেয়া- এসব অগ্রহণযোগ্য। খুবই খারাপ উদাহরণ। এটা ‘অপারগ’ চীনের স্বার্থ মনে করে আপাতত প্রবোধ মনকে দিলেও এই মূল্য একদিন চীনকে শোধ করতে হবে। এই একই ফর্মুলায় আমরা বেল্ট-রোড উদ্যোগে যুক্ত হতে না পারলে তা আত্মঘাতী- চীন ও বাংলাদেশের জন্যই।

গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের তৃতীয় পর্যায়ের নেতা হিসেবে চীনকে অবশ্যই স্টান্ডার্ড, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার উন্নত মানের প্রতিষ্ঠান হওয়া এবং কাজের নীতি অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই।

গৌতম দাস: রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

পাঠক মন্তব্য () টি

তারেক রহমান: আপনার প্রধান প্রতিপক্ষ তথ্যসন্ত্রাস

আপনার দুর্ভাগ্য আপনি আধিপত্যবাদী শক্তির শিখন্ডি গোষ্ঠীর তথ্যসন্ত্রাসের নির্মম শিকার।

ভারতে অর্থনৈতিক মন্দার শঙ্কা

মোদি সরকারের নীতির ভারনীয় অর্থনীতির পতন আসন্ন।

কুর্দিদের ভবিষ্যৎ

নিপীড়ন এবং সহিংসতা কখনোই কুর্দি সমস্যার সমাধান করবে না।

কপিরাইট ২০১৪ onlineBangla.com.bd
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: গুলবুদ্দিন গালীব ইহসান
অনলাইন বাংলা, ৬৯/জি গ্রিন রোড, পান্থপথ (নীচ তলা), ঢাকা-১২০৫।
ফোন: ৯৬৪১১৯৫, মোবাইল: ০১৯১৩৭৮৯৮৯৯
ইমেইল: contact.onlinebangla@gmail.com
Developed By: Uranus BD