সর্বশেষ আপডেট ১৯ ঘন্টা ১৫ মিনিট আগে
আপনি আছেন হোম / মতামত / কলাম / দুর্লভ সাঁইজির বয়ানে লালন সাঁইজি

দুর্লভ সাঁইজির বয়ানে লালন সাঁইজি

প্রকাশিত: ১২ মার্চ ২০১৭ ১৭:২৫ টা | আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০১৭ ১১:৫৬ টা

বেনজীন খানঃ

‘সাঁইজির কোনো জন্ম নেই। তিনি জন্ম-মৃত্যুর অতীত। তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন এই কালিগঙ্গার ধারে। আর পহেলা কার্তিক দেহ রেখে যান।’

বলছিলেন দুর্লভ সাঁই। লালন সাঁইয়ের শিষ্য ভোলাই সাঁই, ভোলাই সাঁইয়ের শিষ্য কোকিল সাঁই। কোকিল সাঁইয়ের শিষ্য দুর্লভ সাঁই।

বছরটা ঠিক মনে নেই। তবে প্রায় ১০-১৫ বছর আগে কোনো এক দোলে গিয়েছিলাম কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ায় লালন আখড়ায়। লালন সাঁইজি তাঁর জীবদ্দশায় প্রতিবছর এই দোল পূর্ণিমার তিথিতে সাধুসঙ্গ দিতেন। নানা স্থান থেকে সাধু-গুরু আসতেন। সঙ্গ হতো। জীবন, জগৎ নিয়ে আলোচনা হতো। গরিবানা হালে সাঁইজি যা পারতেন সাধু-গুরুদের খাওয়াতেন।

সেই থেকে আজ অবধি প্রতিবছর দোল পূর্ণিমার দিন এই ছেউড়িয়ায় লালনধামে লালন-উৎসব পালন হয়ে থাকে।

এখন অবশ্য বছরে দুইবার এখানে অনুষ্ঠান হয়। প্রতিবছর পহেলা কার্তিকে সাঁইজির দেহ রেখে যাওয়াকে স্মরণ করে পালন করা হয় ‘স্মরণোৎসব’।

সেবারের দোল উৎসবে আমরা গিয়েছিলাম লালনালয়ে। যশোর থেকে আমার সাথে আরো ছিলেন অ্যাডভোকেট কাজী মুনিরুল হুদা, সাংবাদিক মতিনুজ্জামান মিটু প্রমুখ।

লালনধামের সামনে অর্থাৎ দক্ষিণে অবস্থিত কবি ফরহাদ মজহারের ‘নবপ্রাণ আন্দোলন’-এর আখড়াবাড়ি। খুব সকালে এই আখড়াবাড়িতে শুরু হয়েছিল লালন সাঁইজির গোষ্ঠগান। জানা যায়, সাঁইজি তাঁর জীবদ্দশায় মাত্র নয়টি গোষ্ঠগান রচেছিলেন। এই ‘কালাম’ পাঠের রীতি হলো- সুবেহ সাদিকের পর থেকে পুব আকাশে লাল সূর্য দিনের আলো ছড়ানোর আগ পর্যন্ত।

সকাল আটটা-সাড়ে আটটার আগেই গোষ্ঠগান শেষ হয়েছে। এখন আয়োজন চলছে সেবা গ্রহণের। শাদা পোশাকে খিড়কাধারী সাধুরা সারিবদ্ধ বসে আছেন। কবি ফরহাদ মজহারের গুরু রব সাঁইজির ডান ও বামে সাধু-গুরুরা বসা শুরু করেছেন। আমরা বসে আছি মঞ্চের সামনে, যেখানে বসে গোষ্ঠগান শুনছিলাম। আর বিস্ময়দৃষ্টিতে দেখছিলাম লালন-কানুন।

এমন সময় চোখে পড়লো একজন বৃদ্ধ সাধুকে। বয়স আনুমানিক ৯৫ হবে। চোখে দেখেন না। হাত ধরে নিয়ে আসছিলেন তাঁর সাধনসঙ্গী। উদ্দেশ্য সেবা গ্রহণ। সেবা গ্রহণ মানে খাবার গ্রহণ। চরম আগ্রহে সাঁইজিকে সালাম দিয়ে তাঁর সাধনসঙ্গীকে অনুরোধ করলাম আমাদের সাথে বসতে। সাধুগুরু বসলেন। আমরা পরচয় দিয়ে খুব সাবধানে জানতে চাইলাম সাধুর নাম।

বললেন: ‘দুর্লভ সাঁই’।
বয়স-- পাঁচ কুড়ির কিছু কম।
গুরু-- কোকিল সাঁই। সাঁইজির শিষ্য।
সাথে-- আমার সাধনসঙ্গী।
লালন সাঁই সম্বন্ধে কিছু বলবেন?
দুর্লভ সাঁই : সে তো অনেক কথা, বাবা।

জেনে নিলাম সেবা প্রদান দেরি হবে।

দুর্লভ সাঁই বলা শুরু করলেন : আমি যা জেনেছি গুরুভাই, গুরু, দাদাগুরুদের কাছ থেকে, তা হলো : লালন সাঁইজি এই কালিগঙ্গায় ভেসে এসেছিলেন। এই যেখানে বসে আছেন, এখানে নদী ছিল। নাম কালিগঙ্গা। পদ্মার শাখা। এই কালিগঙ্গার কিনারে ছিল একটা ডুমুরগাছ। এই ডুমুরগাছের শিকড়ে সাঁইজি আটকে ছিলেন।

এই এলাকার একজন পরহেজগার মানুষ- নাম মলম শাহ। তিনি ফজরের নামাজের জন্য এই কালিগঙ্গায় এসেছিলেন ওজু করতে। তখন বেশ অন্ধকার ছিল। ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না সবকিছু। তিনি লক্ষ্য করলেন, কী যেন ভেসে আছে গাছের শেকড়ের সাথে। খেয়াল করে দেখেন একটা মানুষের বাচ্চা। বাচ্চা ছেলে। মাথাটা শেকড়ে বেঁধে আছে। আর ধড় (দেহ) পানিতে ভাসছে। মলম শাহ একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। উনি বাড়ি চলে যান। স্ত্রীকে বলেন। জানা যায়, তাঁর স্ত্রীর নাম ছিল মতিজান বিবি। তাঁরা স্বামী-স্ত্রী ছিলেন নিঃসন্তান। মতিজান বিবির খটকা লাগলো। তিনি মলম শাহকে নিয়ে ছুটে এলেন। গঙ্গাধারে।

ইতিমধ্যে অন্ধকার সরে গিয়ে সলক হয়ে গেছে। তারা দেখেন ১৭-১৮ বছরের একটি বালক। সারা গায়ে ঘা। বসন্ত রোগের ঘা। মায়ের জাত তো! মতিজান বিবির দরদ হলো। তিনি মাতৃস্নেহ দিয়ে শরীর স্পর্শ করে বুঝলেন, ছেলেটি এখনো বেঁচে আছে। কোলে তুলে নিলেন। দুইজনে মিলে ছেলেটাকে বাড়ি আনলেন। নরম শুকনো কাপড় অথবা তুলা দিয়ে আস্তে আস্তে শরীরের ঘা থেকে পানি শুষে নিলেন। শেষ পর্যন্ত ছেলেটা বেঁচে যায়।

মতিজান তো খুব খুশি। নিঃসন্তান নারী যেন মা হয়েছেন। কিন্তু দুখিনীর দুঃখ কি এতো সহজে যায়! ছেলেটি বেঁচে উঠলো বটে, কিন্তু সে যে ‘মা’ বলে ডাকবে না! কারণ সে বোবা। কথা বলতে পারে না। ফলে মতিজান বিবি ও মলম শাহ জানতে পারলেন না তার নাম-ধাম, কুল পরিচয়। তবুও সান্তনা, তাদের একটি ছেলে আছে। মা তাকে খাওয়াতে পারবেন। আদর করতে পারবেন। তাকে নিয়ে মা ভাবতে পারবেন। এও কী কম আনন্দের!

একদিন সকালে মলম শাহ ফজরের নামাজ শেষ করে ঘরের হাতনেয় (বারান্দা) বসে কোরান শরিফ পড়ছিলেন। পেছনে উঠোন ভেদ করে পুব আকাশের মিষ্টি রোদে তিনি প্রতিদিনই কোরান পড়েন। আজ হঠাৎ পেছন থেকে একটা ‘ইস’ কাতর আওয়াজ শুনলেন। মলম শাহ পেছন ফিরে দেখেন, ছেলেটি পাশ ঘেঁষে চলে গেল। প্রায় ১০-১৫ দিন পর মলম শাহ একই ধরনের ঘটনা লক্ষ্য করলেন। তিনি কোরান বন্ধ করে ছেলেটিকে ধরলেন, আর জানতে চাইলেন---

কী হয়েছে, বাবা?
তোমার কি কষ্ট হয়?
তুমি এভাবে কাতরাচ্ছ কেন?
ছেলেটি কথা বললো। কোরানের ভুল উচ্চারণ বিষয়ে বললো।
মলম শাহ তো হতবাক।
প্রথমত, ছেলেটি কথা বলতে পারে!
দ্বিতীয়ত, কোরানের উপরে তার এতো দক্ষতা!

তিনি আনন্দে উত্তেজিত হয়ে দৌড়ে রান্নাঘরে গিয়ে মতিজানকে সব কথা খুলে বলেন। মতিজানের বিশ্বাস হয়নি। তিনি ছেলের কাছে দৌড়ে যান, জানতে চান। কিন্তু ছেলে নীরব। আগের মতোই। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। কথা বলতে জানে না।

মতিজান মলম শাহকে বললেন, ‘এ তোমার বিভ্রম। আকাঙ্ক্ষাকে সত্য মনে করেছ।’

এর কিছুদিন পর ছেলেটি হারিয়ে যায়। কেউ তার কোনো খবর দিতে পারে না। মতিজান কান্নাকাটি করতেন। প্রায় বছর ২-৩ পর ছেলেটি আবার চলে আসে একটি ঘোড়ায় চড়ে। মহাচিন্তা ও রহস্যের মধ্যে পড়ে গেল মলম পরিবার। ঘোড়া দেখে শহরের বড় ঘরের ছেলেরাও তার বন্ধু হতে লাগলো। সবাই একবার করে তার ঘোড়ায় চড়ে। এখন তার অনেক বন্ধু। আবার ছেলেটি হারিয়ে যায়। কোনো খবর নেই। ৯-১০ মাস পরে আবার ফিরে এলো। সাথে সুন্দরী একটা মেয়ে। মলম পরিবার ভয় পেয়ে গেলো। তারা আর ছেলেটিকে আশ্রয় দিতে চাইলেন না। মানুষও কানুঘুষা করতে লাগলো। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, মেয়েটিও কথা বলতে পারে না। এর পর তারা দু’জনেই হারিয়ে গেল। একেবারে নিরুদ্দেশ।

কত বছর পরে ঠিক মনে নেই, তবে অনেক বছর পর ছেলেটি তখন বেশ যুবক, আবার ফিরে এলো মলম পরিবারে। কিন্তু এবার মানুষজন কেউই তাকে আর মেনে নিতে পারলো না। সবাই উত্তেজিত জেরা শুরু করলো। হাজারো প্রশ্ন তাদের---
কী তোমার নাম?
কোথায় বাড়ি?
কোন জাতের তুমি?
কী তোমার কুল?
মানুষের রাগ, ক্ষোভ, জিজ্ঞাসার যেন আর শেষ নেই। কারণ ছেলেটি খুবই রহস্যময়। এমনই কোনো এক বিকেলে মানুষ ঘিরে ধরেছে তাকে। হয়তো মারতে চায় তারা।

আর এই প্রথম ছেলেটি জনসম্মুখে কথা বললো---

‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে’

জানা গেলো তার কোনো জাত-কুল নেই। নাম তার লালন ফকির।
শুরু হলো লালনের কথা বলা। অনর্গল কথা বলা।
কিন্তু এ কথা ছিল কালাম।
আপনারা বলেন গান।
আসলে হবে সাঁইজির কালাম।

এর পর অনেক ঘটনা।
এ অঞ্চলের মানুষ তো খারাপ। তারা সাঁইজিকে বুঝতে পারেনি তখন। কত অপবাদ দিয়েছে। মতিজানের সাথে জড়িয়েও অপবাদ দিয়েছে। যিনি জীবন-যৌবন ত্যাগ করে তরাতে এসেছিলেন মানবের। সে মানবেরে পথ দেখিয়ে দেহ রেখে চলে গেছেন পহেলা কার্তিকে...

বেনজিন খান: কবি, লেখক ও গবেষক

পাঠক মন্তব্য () টি

তারেক রহমান: আপনার প্রধান প্রতিপক্ষ তথ্যসন্ত্রাস

আপনার দুর্ভাগ্য আপনি আধিপত্যবাদী শক্তির শিখন্ডি গোষ্ঠীর তথ্যসন্ত্রাসের নির্মম শিকার।

ভারতে অর্থনৈতিক মন্দার শঙ্কা

মোদি সরকারের নীতির ভারনীয় অর্থনীতির পতন আসন্ন।

কুর্দিদের ভবিষ্যৎ

নিপীড়ন এবং সহিংসতা কখনোই কুর্দি সমস্যার সমাধান করবে না।

কপিরাইট ২০১৪ onlineBangla.com.bd
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: গুলবুদ্দিন গালীব ইহসান
অনলাইন বাংলা, ৬৯/জি গ্রিন রোড, পান্থপথ (নীচ তলা), ঢাকা-১২০৫।
ফোন: ৯৬৪১১৯৫, মোবাইল: ০১৯১৩৭৮৯৮৯৯
ইমেইল: contact.onlinebangla@gmail.com
Developed By: Uranus BD