সর্বশেষ আপডেট ৪ ঘন্টা ৫৩ মিনিট আগে
আপনি আছেন হোম / সাহিত্য বাংলা / বই / রুমির কবিতা থেকে ইসলাম মুছে ফেলার কসরত

রুমির কবিতা থেকে ইসলাম মুছে ফেলার কসরত

প্রকাশিত: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ০০:৫৪ টা | আপডেট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ২২:৫৬ টা

রোজিনা আলীঃ

দুই বছর অভিনেত্রী গিনেথ পালট্রুর সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদের প্রক্রিয়া চলার সময় কোল্ডপ্লের (ব্রিটিশ রক ব্যান্ড) ক্রিস মার্টিন অনেকটাই ভেঙে পড়েছিলেন, তখন তাকে একজন বন্ধু একটা বই দিয়েছিলেন যাতে তার মনোবল চাঙ্গা হয়। এটি ছিল তের শতকের পারসিয়ান কবি জালাল উদ্দিন রুমির কবিতার একটি সংকলন, যা কোলম্যান বার্কস তরজমা করেছেন। পরে এক সাক্ষাৎকারে মার্টিন বলেন, এটি আমার জীবন আমূল বদলে দিয়েছে। কোল্ডপ্লের সাম্প্রতিক একটি অ্যালবামে বার্কস অনূদিত রুমির একটি কবিতা রাখা হয়েছে। তাহলো- ‘এটি মানুষের একটি সরাইখানায় পরিণত হয়েছে/ যেখানে প্রতিদিন সকালে একজন নতুন মুসাফির আসে/আসে আনন্দ, আসে হতাশা, আসে নীচতা/ ক্ষণিকের কিছু সংবেদনশীলতারও আগমন ঘটে/ যেন অপ্রত্যাশিত পরিদর্শক হিসেবে।'

মেডোনা, টিলডা সুইনটনের মতো সেলিব্রেটিদের আধ্যাত্মিক সফরেও রুমি ছিলেন পাথেয়, তাদের মধ্যে কেউ কেউ নিজেদের শিল্পকর্মেও রুমির কাজকে ব্যবহার করেছেন। অনুপ্রেরণা যোগানোর প্রবচনের উৎস হিসেবে রুমির কবিতা প্রতিদিন সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে। এরমধ্যে একটি হলো 'যদি তুমি প্রতি ঘষাতেই বিরক্ত হও, তাহলে তুমি কিভাবে চকমকে উজ্জ্বল হবে'। আরেকটি হলো, 'প্রতি মুহূর্তে আমি নিজের ভাগ্যকে একটি বাটালি দিয়ে আকার দিতে চেষ্টা করি, আমিই আমার আত্মার ছুতার। ' ইন্টারনেটে বার্কস অনূদিত রুমির কবিতাই ব্যাপকভাব ছড়িয়ে পড়েছে, এছাড়াও তার অনুবাদ মার্কিন বইয়ের দোকানের তাকে জায়গা করে নিয়েছে এবং বিয়ের অনুষ্ঠানেও তার অনুবাদ করা কবিতাই বেশি আবৃত্তি হয়ে থাকে। প্রায় সময়েই রুমিকে যুক্তরাষ্ট্রে সর্বাধিক বিক্রিত কবি হিসেবে বর্ণনা করা হয়ে থাকে। রুমি সাধারণত একজন মরমি সাধক, দরবেশ, সুফি বা আলোকিত মানুষ হিসেবে পরিচিত। আশ্চর্য ব্যাপার হলো, আজীবন কুরআন ও ইসলামের একজন বুজুর্গ হওয়া সত্ত্বেও রুমির মুসলিম পরিচয়ের কথা খুব একটা উল্লেখ করা হয় না।

মার্টিন তার অ্যালবামে যে কবিতা ব্যবহার করেছেন তা রুমির জীবন সায়াহ্নে লেখা ছয়খণ্ডের বিখ্যাত মহাকাব্য 'মসনবি' থেকে নেয়া। এর পঞ্চাশ হাজার পঙক্তির বেশির ভাগই ফারসি ভাষায় লেখা, কিন্তু এগুলোতে মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থের প্রচুর আরবি উদ্ধৃতির উল্লেখ রয়েছে, আর মসনবিতে হরদম কুরআনের নৈতিক শিক্ষাসমৃদ্ধ গল্প ব্যবহার করা হয়েছে।  (কিছু পণ্ডিত কে ফারসি ‘কুরআন’ আখ্যা দিয়ে থাকেন, তারা মনে করেন মসনবির রচনা অসমাপ্ত রয়ে গেছে।)  মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটির পারসিয়ান স্টাডিজের অধ্যাপক ফাতেমা কেশাভারজ আমাকে বলেছেন, রুমি তার কবিতায় কুরআনকে এতে বেশি টেনে এনেছেন যে তাতে মনে হয় সম্ভবত তিনি কুরআন হেফজ করেছিলেন।  রুমি নিজে অবশ্য মসনবিকে ইসলামের ব্যাখ্যা এবং কুরআনের তফসির হিসেবে ধর্মভিত্তির ভিত্তি এবং তারও ভিত্তি বলে বর্ননা করে গেছেন। অথচ যুক্তরাষ্ট্রে বহুল বিক্রিত মসনবির অনুবাদে এই ধর্মের পরিচয় খুব কমই খুঁজে পাওয়া যায়। সম্প্রতি আমাকে রুটগার্সের প্রথম জমানার সুফিবাদ বিষয়ক পণ্ডিত জাবিদ মোজাদ্দেদি বলেছেন, ইংরেজিতে অনূদিত রুমির কবিতা লোকজন যে ভালোবাসে এটি খুবই সুন্দর ব্যাপার এবং এর জন্য আপনি যে পয়সা দিচ্ছেন তা দিয়ে ইসলামী সংস্কৃতি ও ধর্মের পরিচয় ছেটে ফেলা হচ্ছে।

রুমি তের শতাব্দীর শুরুতে পারস্যে জন্মগ্রহণ করেন, ওই জায়গাটিই এখন বর্তমান আফগানিস্তান। পরে পরিবারের সঙ্গে তিনি কোনিয়া তথা বর্তমানের তুরস্কে স্থায়ী হন। তার বাবা ছিলেন একজন মুবাল্লিগ তথা ধর্মপ্রচারক এবং আলেম, তিনিই রুমিকে সুফিবাদের সঙ্গে পরিচিত করান। পরে রুমি সিরিয়াতে ইসলামী ধর্মতত্ত্বের উপর পড়াশোনা করেন, সেখানে তিনি সুন্নি ইসলামের প্রচলিত শরীয়া আইনের কানুন শেখেন। পরে তিনি কোনিয়াতে একজন মাদরাসা শিক্ষক হিসেবে ফিরে আসেন। আর এখানেই তিনি প্রবীণ পরিব্রাজক শামস-ই-তাবরিজের দেখা পান, যিনি পরবর্তীতে রুমির মুর্শিদে পরিণত হন। দুজনের মধ্যকার ঘনিষ্ঠ সখ্যতার বিষয়ে অনেক বিতর্ক থাকলেও সবাই স্বীকার করেন রুমির ধর্মীয় অনুশীলন (এবাদত-বন্দেগী) এবং কবিতা চর্চার উপর তাবরিজের স্থায়ী প্রভাব ছিল। ব্রাড গুশের লেখা 'রুমির সিক্রেট' নামে এ দরবেশের এক নতুন জীবনীতে তুলে ধরা হয়েছে তাবরিজ কিভাবে রুমিকে নিজের প্রথাগত ধর্মীয় পড়াশোনাকে প্রশ্ন করতে তাগিদ যুগিয়েছেন, রুমির সঙ্গে তিনি কুরআনের নানা বিষয় নিয়ে বিতর্ক করেছেন এবং আল্লাহর একত্বকে খুঁজে পেতে একাগ্র বন্দেগীর ধারণার ওপর জোর দিয়েছেন। রুমি আল্লাহর প্রতি যে সহজাত প্রেমে সিক্ত হয়েছিলেন তা তিনি পেয়েছিলেন সুফিবাদসহ শামে অর্জিত সুন্নি ইসলামের শরীয়া এবং মরমি চিন্তার শিক্ষা থেকে।

কেশভারজ আমাকে বলেছেন, এই সব গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবের জটিল সংমিশ্রণ রুমিকে তার সমসাময়িকদের চেয়ে আলাদা করেছে। যার ফলে রুমি কোনিয়ায় সার্বজনীনভাবে বেশ অনুসরনীয় হয়ে ওঠেন, তার অনুসারীদের মধ্যে স্থানীয় সুন্নি সেলজুক শাসকরাসহ সুফি, মুসলিম আলেম এবং ধর্মতাত্ত্বিকগণ, খ্রিস্টান এবং ইহুদিরাও ছিল। রুমির সিক্রেট বইয়ে গুশ যথাযথভাবেই সেই সব রাজনৈতিক ঘটনাবলী এবং ধর্মীয় শিক্ষার কথা তুলে ধরেছেন যা রুমিকে প্রভাব্তি করেছিল। তিনি লিখেছেন, রুমি একটি ধর্মানুরাগী মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন, সারা জীবনই তিনি প্রতিদিন পাঞ্জেগানা নামাজ আদায় করতেন এবং রোজা রাখতেন। তা সত্ত্বেও গুশের বইয়ে এইসব তথ্যপ্রমাণ এবং রুমির ব্যাপারে তার নিজস্ব উপসংহার টানার মধ্যে বৈপরিত্তের উত্তেজনা রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে রুমির পটভূমিকে আবছা করে গুশ বলেছেন যে রুমি সব প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসের বাইরে গিয়ে একটি 'প্রেমের ধর্ম' তৈরি করেছিলেন। এ ধরনের পাঠ রুমির ইসলামী শিক্ষার চেহারাই বদলে দেয়, এমনকি 'প্রেমের ধর্মের' মতো  তার ধারণাকেও সীমাবদ্ধ করে ফেলে। মোজাদ্দেদি তার মন্তব্যে বলেছেন, কুরআন উম্মাহর ধারণা বা বিশ্বজনীনতাবোধের প্রস্তাবনাতেই খ্রিস্টান এবং ইহুদিদের আহলে কিতাব হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। রুমির নামে বর্তমানে যে বিশ্বজনীনতার পূজা করা হচ্ছে তাও তার মুসলিম পটভূমি থেকেই এসেছে।

রুমির কবিতা থেকে ইসলাম মুছে ফেলার কাজ কোল্ডপ্লে জড়িত হওয়ার অনেক আগেই শুরু হয়েছিল। ডিউক ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য ও ইসলামী শিক্ষার অধ্যাপক ওমিদ সাফি বলেছেন,  ভিক্টোরীয় যুগে মরমি কবিতাকে তার ইসলামী ভিত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করে পড়ার প্রচলন শুরু করে পশ্চিমা পাঠকরা। তখনকার অনুবাদক এবং ধর্মতান্ত্রিকরা ভেবেই কুল পায়নি যে একটি 'মরুভূমির ধর্মের' সাথে তার গুরুত্বপূর্ণ ন্যায়নীতি ও আইনী বিধান এবং রুমি-হাফিজের মতো কবির কাজের সম্পর্ক থাকতে পারে। সাফি আমাকে বলেছেন, তারা নিজেদের মনোভাবের অযুহাত হিসেবে এমনটাই সাব্যস্ত করে নিয়েছিল যে রুমি-হাফিজের মতো মানুষেরা মুসলিম হলেও তাদের মরমি সাধক হয়ে ওঠার কারণ ইসলাম নয়। এটি ছিল ওই সময় যখন আইনী বৈষম্য করে মুসলমানদের একঘরে করে ফেলা হতো, ১৭৯০ সাল থেকে একটি আইনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে আগমনকারী মুসলমানের সংখ্যা সঙ্কুচিত করে ফেলা হচ্ছিল, এর একশ' বছর পরে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট মুসলমানদের অন্য সব সম্প্রদায় বিশেষ করে খ্রিস্টানদের প্রতি তুমুল শত্রুতা পোষণকারী হিসেবে বর্ণনা করেছিল।  স্যার জেমস রেডহাউজ ১৮৯৮ সালে তার অনূদিত মসনবির ভূমিকায় লিখেছেন, মসনবিতে তাদের কথাই বলা হয়েছে যারা দুনিয়াদারিকে ছেড়ে আল্লাহকে জানতে চায় এবং তার প্রিয়ভাজন হতে চায়, নিজেদের আমিত্বকে বিসর্জন দেয় এবং রূহানী ফিকিরের জন্য নিজেদের নিবেদন করে। এসব কারণেই পাশ্চাত্যে রুমি এবং ইসলামকে আলাদা করে ফেলা হয়েছে।

বিশ শতকে ইংরেজি ভাষাভাষীদের কাছে রুমির উপস্থিতি জোরদার হয়েছে একদল প্রখ্যাত অনুবাদকের মাধ্যমে, তাদের অন্যতম হলেন আর এ নিকলসন, এ জে আরবারি এবং অ্যানেমেরি শিমেল। কিন্তু বার্কসের মাধ্যমেই রুমির পাঠক সংখ্যা ব্যাপকহারে বেড়েছে। তিনি যতটা না রুমির অনুবাদক তার চেয়েও বেশি ব্যাখ্যাকারী। তিনি ফার্সি পড়তে বা লিখতে পারেন না। তিনি স্রেফ উনিশ শতকের অনুবাদগুলোকে আমেরিকান ভাষ্যে রূপান্তর করেছেন।

এই ভাষ্য এক বিশেষ ধরনের ভাষ্য। বার্কস ১০৩৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং টেনেসির চাট্টানুগাতে বেড়ে ওঠেন। তিনি ইংরেজি সাহিত্যে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ১৯৭১ সালে 'দ্য জুস' নামে নিজের প্রথম কবিতার বই প্রকাশ করেন। আরও এক দশক পরে আরেক কবি রবার্ট ব্লাই তাকে আরবারি অনূদিত রুমির কবিতার একটি বই তুলে দিলে প্রথমবারের মতো রুমির নাম শোনেন বার্কস। ওই সময় ব্লাই বলেন, এটি (রুমির কবিতা) তাদের খাঁচা থেকে বের করতে হবে, এজন্য এর আমেরিকান ভাষ্য তৈরি করতে হবে। ত্রিশ বছরেরও আগে নিউইয়র্কারে ব্লাইয়ের কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল, ১৯৯০ সালে 'আয়রন জন, এ বুক এবাউট ম্যান' নামে তার কবিতার বই ছাপা হয়েছিল, পরে তিনি নিজেও রুমির কিছু কবিতা অনুবাদ করেছিলেন। বার্কস জীবনে কোনোদিন ইসলামী সাহিত্য পড়েননি। কিন্তু সম্প্রতি তিনি আমাকে তার জর্জিয়ার বাড়ি থেকে টেলিফোনে বলেছেন, কিছু দিন  (ব্লাইয়ের কাছ থেকে বই পাওয়ার) পরেই তিনি একটি স্বপ্ন দেখেন। এতে নদীর তীরে একটি বাঁধের উপর নিজেকে শায়িত দেখেন তিনি। হঠাৎ করে তিনি একজন ভিনদেশীকে আলো পরিবেষ্টিত অবস্থায় আবির্ভূত হতে দেখেন, ওই লোক তাকে বলেন, 'আমি তোমাকে ভালোবাসি'। বার্কস আগে কখনো তাকে দেখেননি, কিন্তু পরের বছর ফিলাডেলফিয়ার কাছে একটি সুফি মজলিশে তাকে দেখতে পান তিনি। ওই ব্যক্তি মজলিশের প্রধান ছিলেন। পরে সেখানে বিকাল পর্যন্ত অবস্থান করে ব্লাইয়ের দেয়া রুমির কবিতার বই পড়েন এবং ভিক্টোরীয় যুগের অনুবাদ উলটপালট করেন। এরপর থেকে বার্কস রুমির এক ডজনেরও বেশি বই প্রকাশ করেছেন।

আমাদের আলাপের সময় বার্কস রুমির কবিতাকে 'হৃদয় উন্মোচনকারী রহস্য' বলে বর্ণনা করেন, যা বলে বোঝানো যায় না বলে আমাকে বলেন তিনি। এই অবর্ণনীয় বিষয়টিকে বর্ণনা করার জন্য তিনি রুমির কাজের অনুবাদের ব্যাপারে কিছুটা স্বাধীনতা নিয়েছেন বলে জানান বার্কস। এমনটি করতে গিয়ে তিনি একটি কাজ করেছেন, তাহলো তিনি রুমির কবিতার অনুবাদ থেকে ইসলামী বরাত বা রেফারেন্সগুলোকে ছেটে ফেলেছেন। রুমির বিখ্যাত কবিতা 'এ রকম' (Like This)-এর কথা উল্লেখ করা যায়, আরবারি এ কবিতার একটা লাইন যথার্থভাবেই অনুবাদ করেছেন যে, 'যেকেউ তোমাকে হুরদের ব্যাপারে জিজ্ঞাস করলে/দেখাও (তোমার) সুরত (এবং বলো) এই রকম'। হুররা হলো কুমারী নারী যাদের বেহেশতে পাওয়া যাবে বলে ইসলামে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বার্কস তার অনুবাদে হুর শব্দের আক্ষরিক অনুবাদ পর্যন্ত বাদ দিয়েছেন, তার সংস্করণে কবিতাটির ওই লাইনটিকে এভাবে তুলে ধরা হয়েছে, 'যদি কেউ তোমার কাছে জানতে চায় আমাদের সকল যৌন বাসনার পরিতৃপ্তির নিখুঁত আদলটি কেমন হবে, তাহলে মুখ তুলে তাকাও এবং বলো এই রকম'। এখানে পুরো ধর্মীয় প্রেক্ষাপটটিই হাপিশ হয়ে গেল। অবশ্য একই কবিতার অন্য লাইনে তিনি খ্রিস্টানদের নবী জেসাস (প্রকৃতপক্ষে ঈসা নবী) এবং জোসেফের (ইউসুফ নবী) বরাত বহাল রাখেন। আমি যখন তাকে এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম তখন তিনি বলেন যদি সচেতনভাবেও ইসলামী বরাত মুছে ফেলেও থাকেন তা এখন তিনি মনে করতে পারছেন না। তিনি বলেন, আমি প্রেজবিটিরিয়ান ( খ্রিস্টান বিশপ শাসিত চার্চের সদস্য) হিসেবে বড় হয়েছি।। আমি বাইবেলের শ্লোক মুখাস্ত করতাম এবং আমি কুরআনের চেয়েও নিউ টেস্টামেন্ট ( বাইবেল) ভাল বুঝতাম। কুরআন পড়াও কঠিন।

ওমিদ সাফিও আরও অনেকের মতো বার্কসকে এই কৃতিত্ব দেন যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের লাখ লাখ পাঠকের সঙ্গে রুমিকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। রুমির কবিতাকে আমেরিকানে ভাষ্যে রূপান্তর করতে গিয়ে বার্ক কবির কাজ ও জীবনের প্রতি উল্লেখযোগ্য সময় দিয়েছেন ও ভালোবাসা দেখিয়েছেন। আমেরিকায় আরও কিছু অনুবাদ রয়েছে যাতে খোদ রুমিকেই বাদ দেওয়া হয়েছে, এক্ষেত্রে  আধ্যাত্মিক বই (নিউ এইজ) হিসেবে দীপক চোপড়া এবং ড্যানিয়েলে লাডিনস্কি অনূদিত বইগুলোর কথা বলা যায়, এসব রুমির বই হিসেবে বাজারজাত এবং বিক্রি করা হলেও এতে রুমির লেখা কবিতার খুব কমই সাদৃশ্য রয়েছে। চোপড়া নানা আধ্যাত্মিক অনুশীলন বিষয়ক লেখক এবং বিকল্প ওষুধ তথা কবিরাজির প্রতি আগ্রহী, তিনি স্বীকার করেন তার কবিতাগুলো আসলে রুমির কবিতা নয়। তবে তিনি 'রুমির ভালোবাসার কবিতা' (দ্য লাভ পোয়েমস অব রুমি) বইয়ের ভূমিকায় লিখেছেন, এই কবিতাগুলো হলো এমন সাহিত্যকর্ম যার অর্থ মূল ফারসি থেকে নিয়ে এগুলোকে নতুন সৃষ্টি হিসেবে জীবন দেয়া হয়েছে, কিন্তু উৎসের মৌলিকতাও বজায় রাখা হয়েছে।

নিউ এজ হিসেবে অনূদিত বইগুলো নিয়ে আলোচনাকালে সাফি বলেন, আমি এসব অনুবাদের কাজে এক ধরনের 'আধ্যাত্মিক উপনিবেশবাদ' দেখেছি; এসব এমন এক 'আধ্যাত্মিক মানচিত্র'কে পাশ কাটিয়ে যায়, দাগচিহ্ন মুছে ফেলে এবং জবরদখল করে যা বসনিয়া ও ইস্তাম্বুল থেকে কোনিয়া এবং ইরান থেকে মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানরা তৈরি করেছিল এবং নিজেদের আত্মপরিচয়ের অংশে পরিণত করেছিল। ধর্মীয় পটভূমি থেকে আধ্যাত্মিকতাকে জোর করে মুছে ফেলার ঘটনায় গভীর প্রতিধ্বনি তৈরি হয়েছে। ইসলামকে নিয়মিতভাবে 'ক্যান্সার' হিসেবে চিহ্নিত করছেন হবু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল মাইকেল ফ্লিনসহ অনেকে, এমনকি আজ নীতি নির্ধারকরা বলছে যে অপশ্চিমা এবং অসাদা পক্ষগুলো সভ্যতা বিনির্মাণে কোনো অবদান রাখেনি। [২০ জানুয়ারি ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেয়ার কিছু দিন পর ফ্লিন পদত্যাগ করেছেন]

বার্কস তার অনুবাদে ধর্মকে রুমির ভাবের ক্ষেত্রে অপ্রধান মনে করেছেন। তিনি আমাকে বলছিলেন, বিশ্বের জন্য ধর্ম একটা কলহের ব্যাপার। আমি আমার সত্যকে হাছিল করেছি আর আপনি নিজের সত্যকে হাছিল করেছেন, এটি স্রেফ হাস্যকর একটি ব্যাপার। আমরা সবাই দুনিয়াতে একসঙ্গে আছি এবং আমি আমার হৃদয়কে উন্মোচন করার চেষ্টা করছি, আর একাজে রুমির কবিতা সহযোগিতা করছে।' কেউ বার্কসের এই দর্শনকে কবিতায় রুমির কাজের পদ্ধতির অনুরূপ পদ্ধতি মনে করতে পারে, রুমি তার কবিতায় অসংখ্যবার কুরানের বাণীকে পরিবর্তন করে ব্যবহার করেছেন যাতে তা ফারসি কবিতার ছন্দ ও পঙক্তির সঙ্গে খাপ খায়। কিন্তু পারসিয়ান পাঠকরা এই কৌশলটি শনাক্ত করতে পারলেও, প্রায় সব আমেরিকান পাঠক ইসলামী শিক্ষা সম্পর্কে কিছু জানে না। সাফি কুরান ছাড়াই রুমি পড়াকে বাইবেল ছাড়া মিল্টন পড়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। এমনকি যদি রুমি প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসের ব্যাপারে ভিন্নমতও পোষণ করেন, তাহলেও এটি উল্লেখ করা জরুরি যে তিনি মুসলিম পটভূমিতেই ভিন্নমতাবলম্বী ছিলেন এবং শত শত বছর আগেও ইসলামী সংস্কৃতিতে এমন ভিন্নমতের জায়গা ছিল। রুমির কাজ শুধু ধর্মকে ভিত্তি করেই গড়ে ওঠেনি, এসব কবিতা ইসলামী মণীষার ঐতিহাসিক গতিশীলতারও প্রতিনিধিত্ব করে।

রুমি কুরআন, হাদিস এবং ধর্মকে ব্যাখ্যামূলকভাবে ব্যবহার করেছেন, আর প্রায় সময় এসবের প্রচলিত পাঠ নিয়ে প্রশ্ন করতেন। বার্কসের জনপ্রিয় ভাবানুবাদগুলোর মধ্যে একটা এভাবে করা হয়েছে যে, 'ভালো ও মন্দকাজের ধারণার বাইরেও, সেখানে একটা জায়গা রয়েছে/ যেখানে তোমার সঙ্গে আমার মোলাকাত হবে'। কিন্তু মূল কবিতার কোথাও ভালো কাজ ও মন্দকাজ শব্দ দুটির উল্লেখ নাই। রুমি যে দুটি শব্দ লিখেছেন তা হলো 'ঈমান' (ধর্ম) এবং কুফুরি (অবিশ্বাস)। একবার ভেবে দেখুন যে যে, একজন মুসলিম বুজুর্গ বলছেন যে বিশ্বাসের ভিত্তি ধর্মীয় বিধানে নিহিত নয়, বরং সহমর্মিতা এবং ভালোবাসার এক উচ্চস্থানে স্থাপিত। বর্তমানে আমরা এবং বহু মুসলিম আলেম যেসব ব্যাখ্যাকে বিপ্লবী চিন্তা বলে বিবেচনা করছি সাতশ' বছর আগেই তা রুমি হাজির করেছেন।

তৎকালীন সময়ে এ ধরণের পাঠ কোনো অতুলনীয় ব্যাপার ছিল না। যদিও রুমির কাজের উদ্ভাবনী চিন্তা ছিল নজিরবিহনী, তবে এতে ধর্মীয় আধ্যাত্মিকতা এবং প্রচলিত বিশ্বাসেরই বড় ধরনের লেনদেনের চিত্র ফুটে ওঠেছিল। সাফি বলেছেন, ঐতিহাসিকভাবে বলতে গেলে রুমি এবং হাফিজদের কবিতার মতো কোনো ভাবই মুসলমানরা কুরআনকে ছাড়া রচনা করেনি। আর এ কারণেই যে সময়ে কারও লেখা হাতে লিখে অনুলিপি করতে হতো সেই সময়ে লেখা হওয়া সত্ত্বেও রুমির বিশাল সৃষ্টিভাণ্ডার আজও টিকে আছে।

লেখক ও অনুবাদক সিনান আনতুন বলেছিলেন, ভাষা শুধু যোগাযোগের একটি বাহন নয়। এটি স্মৃতি, ঐতিহ্য এবং উত্তরাধিকারের , মহাফেজখানাও। যখন দুটি সংস্কৃতি একই পথে প্রবাহিত হয় তখন অনুবাদকরা ঐতিহ্যগতভাবে রাজনৈতিক প্রকল্প গ্রহণ করেন। তাদেরকে অবশ্যই সমসাময়িক আমেরিকানদের কাছে তের শতাব্দীর একজন ফারসি কবিকে বোধগম্য করে উপস্থাপন করার উপায় বের করতে হয়। তবে রুমির ক্ষেত্রে তার মূল কাজের মৌলিকতা বজায় রাখার দায়িত্বও রয়েছে অনুবাদকদের, যাতে পাঠকরা বুঝতে পারে ইসলামী শরীয়া বিষয়ক একজন বুজর্গও বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পঠিত প্রেমের কবিতা লিখতে পারতেন।

জাবিদ মোজাদ্দেদি এখন ছয় খণ্ড 'মসনবির' সবগুলো অনুবাদ করার কয়েক বছরব্যাপী প্রকল্পের মাঝামাঝি জায়গায় রয়েছেন। এরই মধ্যে তিন খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে, চতুর্থ খণ্ডও এ বসন্তেই আসার কথা রয়েছে। তার অনুবাদে রুমি আরবী থেকে ফারসিতে অনুবাদ করে ইসলাম এবং কুরআনের যেসব বরাত ব্যবহার করেছেন তা চিহ্নিত করতে ইটালিক করে দেওয়া হয়েছে। তার অনূদিত বইগুলোতে বিভিন্ন পাদটীকাও ব্যবহার করা হয়েছে। এ বইগুলো পড়তে কিছুটা মেহনতের প্রয়োজন হবে এবং সম্ভবত আরেক জনের আন্দাজি ধারণা থেকে বেরিয়ে এসবের মানে খুঁজতে হবে। আর মোটের উপর বিদেশী লেখাকে বোধগম্য করতে এটিই অনুবাদের মূল বিবেচনা হয়ে থাকে। কেশাভারজ অনুবাদের বিষয়ে জোর দিয়ে বলেছেন, এটি হচ্ছে এমন স্মারক যার কাঠামোর মধ্যে মূল রচনার সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সবকিছু থাকবে। একজন মুসলমানের মূল রচনার অনুবাদের বেলাতেও এমনটিই হওয়ার কথা।

 রোজিনা আলী: নিউইয়র্কারের সম্পাদকীয় বিভাগের সদস্য।

পাঠক মন্তব্য () টি

তাবেদারির দিন শেষ, ঘুরে দাড়াও বাংলাদেশ

“তাবেদারির দিন শেষ, ঘুরে দাড়াও বাংলাদেশ- তুমুল আশাবাদ নিয়ে চেয়ে থাকে কেউ…

বইমেলায় কাফি কামালের ‘আত্মীয়তার বন্ধনে রাজনীতি’

একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে কবি ও সাংবাদিক কাফি কামালের রাজনীতি বিষয়ক বই…

হাসিনার নতুন বই ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’

বইমেলা উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছে শেখ হাসিনার নতুন বই ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’।

কপিরাইট ২০১৪ onlineBangla.com.bd
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: গুলবুদ্দিন গালীব ইহসান
অনলাইন বাংলা, ৬৯/জি গ্রিন রোড, পান্থপথ (নীচ তলা), ঢাকা-১২০৫।
ফোন: ৯৬৪১১৯৫, মোবাইল: ০১৯১৩৭৮৯৮৯৯
ইমেইল: contact.onlinebangla@gmail.com
Developed By: Uranus BD