সর্বশেষ আপডেট ৪ ঘন্টা ৪৯ মিনিট আগে
আপনি আছেন হোম / বিদেশ / দক্ষিণ এশিয়া / দানিশ: চোখে-মাথায় ছররাবিদ্ধ কাশ্মীরি তরুণ

দানিশ: চোখে-মাথায় ছররাবিদ্ধ কাশ্মীরি তরুণ

প্রকাশিত: ১১ ডিসেম্বর ২০১৬ ২০:১৪ টা | আপডেট: ১২ ডিসেম্বর ২০১৬ ০১:৪৪ টা

বার্তা ডেস্ক, অনলাইন বাংলাঃ

দানিশ রজব। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের ২৪ বছর বয়সী তরুণ। একটি দুগ্ধজাত পণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানে মার্কেটিং এক্সিকিউটিভের চাকরি করতেন। এক মর্মান্তিক ঘটনায় তার জীবন চিরতরে বদলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এটিই ছিল তার কাজ।

গত ৮ জুলাই স্বাধীনতাকামী জনপ্রিয় তরুণ কমান্ডার বুরহান ওয়ানি ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর হেফজতে নিহত হওয়ার জের ধরে কাশ্মীরে তীব্র জনবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পর দিন থেকে কাশ্মীরে কারফিউ জারি করা হয়। কিন্তু বিপুল সংখ্যক জনতা কারফিউ অমান্য করে রাস্তায় নেমে এই হত্যার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখায়।

কারফিউ প্রত্যাহারের পর ১৭ জুলাই বিকালে দানিশ তার বাড়ির পাশের একটি চায়ের দোকানে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সময় চোখে ও মুখমণ্ডলে ছররা গুলিবিদ্ধ হন। মাত্র ১০ মিটার দূর থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়া হয়। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর দেখেন বন্ধু আশিক তাকে টেনে তুলছেন। এটিই ছিল দানিশের চোখ দিয়ে দেখা শেষ দৃশ্য।

কাশ্মীরে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া অস্থিরতা শুরুর পর  থেকেই কথিত অ-প্রাণঘাতী ছররা গুলিতে নতুন ধরনের এক আঘাতপ্রাপ্তির ঘটনা ঘটছে। নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে যে ছররা গুলি ছুড়ছে তাতে হাজার হাজার মানুষ দৃষ্টি শক্তি হারাচ্ছে বা অন্ধত্ব বরণ করছে।

ছররা বন্দুক দিয়ে দ্রুতবেগে এক সঙ্গে পাঁচশতাধিক গুলি ছোড়া যায়। চিকিৎসকরা বলছেন একটি মাত্র ছররা গুলি যদি চোখে ঢোকে তবে এতেই মারাত্মক ক্ষতি বয়ে আনতে পারে এবং চোখের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।

দানিশ সব কিছু হারিয়ে যন্ত্রণা নিয়ে হাসপাতালে আসেন। তার বাম চোখে শত শত ছররা গুলিভর্তি একটি ধাতব রিং ঢুকে গেছে। এটি যেপথে ঢুকেছে সেখানে চোখের সব কিছুই নষ্ট হয়ে যায়। চোখের ভেতরে ঢুকে যাওয়ার পর রিংটি ফেটে ছররাগুলি বিভিন্ন দিকে ছড়িয়েছিটিয়ে যায়। এতে করে ডান চোখটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাঁ চোখের ক্ষতির পরিমাণ এতটাই গুরুতর যে এটি পুরোপুরি তুলে ফেলতে হয়েছে। তিনি এখন শুধু ডান চোখে দেখতে পান ক্ষীণ ঝাপসা ছায়া দেখতে পান।


দানিশ চুপচাপ বসে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কথা শুনছিলেন। যে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন তার বিহ্বলতা থেকে বেরোতে চেষ্টা করছেন তিনি। তার পরিবার বলছে তিনি এখন অনেক্ষণ ধরে কথা বলতে পারেন না। তিনি বলেন, আমি কি বলব? আপনি তো দেখছেন আমার জীবনে কী ঘটেছে।


দানিশ কোনোভাবেই নিজের এই প্রতিবন্ধিত্ব মেনে নিতে পারছেন না। পরিবার মরিয়া হয়ে তার মনে সাহস জাগিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু তারা নিজেরাই ভেঙে পড়েছে। বেশিরভাগ সময়ে, দানিশ একা একা বসে থাকতে পছন্দ করে।

 
এক্স-রের ছবিতে দেখা যাচ্ছে দানিশের চোখ-চেহারা- মাথায় এখনও শতাধিক ছররা গুলি রয়েছে। চিকিৎসকরা বলেছেন, ছররাগুলি বের করার প্রক্রিয়াটি এমন যে এতে করে তার জীবন ঝুঁকিতে পড়ে যাবে। যেকেউ তার মাথায় হাত দিলে ধাতব জিনিশ অনুভব করতে পারবে। তার দুর্ভাগ্য যে সারা জীবনের জন্য তাকে শরীরের একটি অংশে এসবের যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে হবে।



দানিশের বাবা নিজের খরচে তার চোখের দৃষ্টি ফেরানোর চেষ্টা করছেন। তার আশা চোখটি সেরে উঠবে। কয়েক বছর আগে স্বাস্থ্যগত কারণে কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। তারপর থেকে দানিশ মাসে একশ' ডলারের মজুরিতে কাজ করে সাত সদস্যের পরিবারটির আহার যোগাচ্ছিলেন।



দানিশের বন্ধুরাও প্রায় সময়েই তার সঙ্গে কিছুটা সময় কাটান। তার দুপুরের দিকে আসেন এবং শীতের দিনে সূর্যাস্ত শুরু হলে তারা চলে যান। দানিশ ও তাদের মধ্যে খুব একটা কথা হয় না।


দানিশের ছোটবোন আঙ্গুল দিয়ে সাবধানে তার চোখ খোলেন এবং কান পরিষ্কারের শলা দিয়ে চোখে ড্রপ দেন। এ বোন দানিশের পীঠাপীঠি। বোনটি বলেন, তাকে ঘরে বসে মনোকষ্টে ভুগতে দেখা খুবই কঠিন ব্যাপার। তার কত স্বপ্ন ছিল! সব স্বপ্নই ভেঙেচুরে গেছে।


দানিশের বাবা তার এক মেয়ের ঘরের নাতনীর সঙ্গে বসে আছেন। কাশ্মীরে অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে পড়ায় গত ৮ জুলাই থেকে সে স্কুলে যেতে পারছে না।


টয়লেটের প্রয়োজন শেষে ঘরের দেয়াল ধরে সাবধানে হাঁটছেন দানিশ। তিনি বলেন, আমি ছোটখাটো বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের উপর নির্ভরশীল হওয়াকে ঘৃণা করি। আমি নিজে নিজে হাতড়ে হাঁটার বেশি কিছুই করতে পারি না।


দানিশ যখন নিজে নিজে হাটার চেষ্টা করে তখন তাকে চোখে চোখে রাখেন তার বাবা। তিনি বলেন, আমি অসহায়বোধ করি। তাকে এভাবে হাতড়ে হাতড়ে হাটতে দেখা খুবই যন্ত্রণাদায়ক ব্যাপার, কিন্তু আমি কিছুই করতে পারি না। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, তার এ ঘটনার আগে আমরা গরিব হলেও সুখী পরিবার ছিলাম। কিন্তু এখন আমরা গরিবই না শুধু শোচনীয় দুরাবস্থারও শিকার।


বাবার সঙ্গে তার ভাগ্নি বাড়ির ছোট্ট উঠানে খেলা করছে, পাশেই দানিশ বিষণ্ন মনে বসে আছেন। তিনি বলেন, আমার মনজুড়ে বহুত নেতিবাচক চিন্তা। আমি মন থেকে এসব তাড়াতে চেষ্টা করি। এছাড়া আমার পক্ষে বেঁচে থাকা অসম্ভব। কিন্তু এভাবে আর কতক্ষণ পারব আমি? তিনি বলেন, কয়েক বছর আগে যখন আমার মা মারা গেলে আমি অনেক কেঁদেছিলাম। এখন আমি স্বস্তিবোধ করি যে বেঁচে না থাকায় অন্ধ ছেলেকে দেখা থেকে তো মা রেহাই পেয়েছেন!


দানিশ কাশ্মীরি চা ও বিস্কুট পছন্দ করেন। প্রায় সময়েই তাকে খেতে সাহায্য করেন তার বোন। কারণ নিজে নিজে তিনি মুখে খাবার ঢোকাতে গিয়ে ভুল করে ফেলেন।


বিকাল বেলা বন্ধুরা দানিশকে নিয়ে হাঁটতে বের হন। তারা তাকে হাঁটতে উত্সাহিত করেন। তবে তিনি পাঁচ মিনিটের বেশি হাঁটেন না এবং স্বজনদের নিরাপত্তার জন্য বাড়িতে ফিরে আসেন। তার বোন অশ্রসজল হয়ে বলেন, তিনি কখনোই বাড়িতে বসে থাকতে পছন্দ করতেন না। বরং বাইরে ঘুরতে পছন্দ করতেন। তার দিকে তাকান। তিনি বেঁচে থাকার ইচ্ছাটা ছেড়ে দিয়েছেন।


দানিশ রোদ পোহাতে পছন্দ করেন। কারণ তিনি আলোকে অনুভব করতে পছন্দ করেন। তিনি মুচকি হেসে মাথা নাড়িয়ে বলতে চান তিনি ক্রুদ্ধ নন। এরপর তিনি মাথা উচিয়ে আসমানের দিকে তাকিয়ে লম্বা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, যদি আমি ক্ষুব্ধ হই তাতে আমি কী বা করতে পারব? আমি অসহায়। হ্যা, আমি ক্রুদ্ধ... আমার অনেক রাগ হয়। কিন্তু আমি রাগ সংবরণ করি। আর রাগ তো অন্য কাউকে নয় শুধু আমাকেই কষ্ট দেয়।


দানিশ তার মাথায় হাত বুলিয়ে ঢুকে থাকা ছররা গুলিগুলো স্পর্শ করেন। তার ভাই, তার বাবা এবং তার ছোট্ট ভাগ্নি তার সঙ্গে সময় কাটায়। তার পরিবার সব সময় এটা নিশ্চিত করে যে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি যেন একা না থাকেন। তার বাবা বলেন, আমরা ভয় পাই যে সে কোনো অঘটন ঘটিয়ে ফেলতে পারে।

ছবি ও প্রতিবেদন আল জাজিরা

 

পাঠক মন্তব্য () টি

মমতার 'বিজেপি ভারত ছাড়ো' আন্দোলনের ঘোষণা

অন্য কাউকে ভয় দেখাবেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নয়। ভারতকে কোনোভাবেই টুকরো হতে দেব…

মুসলমানদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলে দেশ সামলানো মুশকিল হবে: আজমি

তথাকথিত গো-রক্ষকদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, যদি এরা এতই 'বীর'…

জামায়াত-হেফাজত নিষিদ্ধের দাবিতে কলকাতায় বিশ্ব হিন্দু পরিষদের বিক্ষোভ

বাংলাদেশে আজ বহু সংখ্যালঘু খুন হচ্ছেন, অনেকে ভারতে পালিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছেন।…

কপিরাইট ২০১৪ onlineBangla.com.bd
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: গুলবুদ্দিন গালীব ইহসান
অনলাইন বাংলা, ৬৯/জি গ্রিন রোড, পান্থপথ (নীচ তলা), ঢাকা-১২০৫।
ফোন: ৯৬৪১১৯৫, মোবাইল: ০১৯১৩৭৮৯৮৯৯
ইমেইল: contact.onlinebangla@gmail.com
Developed By: Uranus BD