সর্বশেষ আপডেট ১৩ ঘন্টা ৩৭ মিনিট আগে
আপনি আছেন হোম / মতামত / ব্লগ / জন্মদাতা না হয়েও তিনি আমার পিতা

জন্মদাতা না হয়েও তিনি আমার পিতা

প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর ২০১৬ ২৩:৫৬ টা | আপডেট: ২০ অক্টোবর ২০১৬ ০২:৩৩ টা

ফয়সাল মুকুটঃ

আমার মা ব্রেন স্ট্রোক করে হাসপাতালে ভর্তি। এমন সময় খুব দ্রুত মোটর সাইকেল চালিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার পথে মারাত্মক সড়ক দূর্ঘটনায় পড়লাম। জখম হয়ে আমিও মায়ের মতো ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি হলাম।

আমি একাই ছেলে সন্তান, তাই নিজেকে শক্ত করে মায়ের চিকিৎসার দিকে লক্ষ্য দিলাম। বাবা আর কাকা দেশের বাড়ীতে। কিছুদিন আগে বাবার বাইপাস করানো হয়েছে। আর কাকা দুইবার ব্রেন স্ট্রোকের রোগী। কাকে যে কি বলবো, বুঝতে পারছি না। আল্লাহর উপর ভরসা করে থাকলাম।

মা একটু সুস্থ হতে লাগল। ডাক্তার বলছিল, আরও এক সপ্তাহ লাগবে, আর ব্রেনে রিং বসাতে হবে। তার জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন। কি করবো বুঝে উঠতে পারছি না।

মাত্র কিছু দিন আগেই আমি কারাগার থেকে বের হয়েছি। আমাকে রাজনৈতিক বল বানিয়ে মিথ্যা মামলায় কারাগারে ঢুকানো হয়। রিমান্ড আর কোর্ট-কাচারি ঠেকানোর জন্য আমার বাবা-মা অনেক ঋণ করে ফেলেন। সব মিলিয়ে আমার মাথার উপর আকাশ ভেঙ্গে পড়ার মত অবস্থা, দিশেহারা আমি! কি করবো বুঝতে পাড়ছি না।

আমি কাকাকে কখনো মিথ্যা কথা বলতে পারি না। তাই কাকাকে কিছু বলি নাই। কাকা ফোন দিলে আমি ধরি নাই। কারণ আমি তাকে মিথ্যা বলতে পারব না। আর সত্যটা শুনলে কাকা যদি আবার স্ট্রোক করে! তাই কিছুই জানাইনি।

হঠাৎ দু'দিন পর সকাল ৮টার দিকে কাকার ফোন এল। আমি বললাম, কাকা ঘুমাচ্ছি, পরে কথা বলবো। সারারাত ব্যথার যন্ত্রণায় কাতর ছিলাম, তাই ভোরের দিকে ঘুম আসে। তাই কাকার সাথে কথা বলা হয়নি।

কিন্তু কাকা যেন বুঝতে পারছিলেন, আমাদের কিছু একটা হয়েছে। তাই তিনি বার বার আমার বন্ধুদের ফোন দিচ্ছিলেন, আর জিজ্ঞেস করছিলেন, কি হয়েছে, আমায় বল? কিন্তু কোন বন্ধুই বলে নাই তাকে।

তিনি ছিল আমার সমস্ত বন্ধুর প্রিয় চাচা। সবাই তাকে শ্রদ্ধা করত। আর কাকা সবাইকে ভালবাসতেন। তিন বছর বয়স থেকে আমি কাকার বুকের উপর ঘুমাতাম। আমার খাওয়া-দাওয়া, গোসল করানো, কাপড়-চোপর পড়ানো সব তিনিই করতেন। আমার বড় বোনেরও সবকিছুই তিনি করেছেন। আমি ঢাকায় উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য আসার আগ পর্যন্ত আমি কাকার কাছে ঘুমাতাম।

আমার কাকা পেশায় একজন ডাক্তার ছিলেন। হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরে এসে মাগরিবের নামাযের পর তিনি ফ্রি রোগী দেখতে শুরু করতেন। যত গরীব-গুরো আছে সবাই আসতেন। অনেক ভিড় হতো। রাত পর্যন্ত রোগী দেখতেন। আর প্রচুর বই পড়তেন। বই পড়ার তার অনেক নেশা ছিল।

তার স্বপ্ন ছিল একটা মসজিদ গড়ার। মহল্লার সবাইকে সাথে নিয়ে তিনি তিলে তিলে একটি মসজিদ তৈরি করেছেন। ওই মসজিদের সেবা করা ছিল তার অন্যতম কাজ গুলোর মধ্যে একটি। তিনি মানুষ খাওয়াতে খুব পছন্দ করতেন। কোন ধর্মীয় উপলক্ষ্য হলেই গরীব খাওয়াতেন। আর রমজান মাসের সারা মাস তিনি মসজিদের মুসল্লিদের ইফতার খাওয়াতেন।

কাকার বিয়ের কথা আমার তেমন মনে নাই। তখন আমি অনেক ছোট। আপুর হয়তো মনে আছে। বিয়ে করে কাকা বাড়িতে এসেছেন, অনেক মজা হচ্ছে। আমি ঠিক ঘুমানোর আগে কাকার বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়েছি। কখন যে মা আমাকে উঠিয়ে নিয়ে গেছে আমি জানি না।

হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে আমি দেখি, বাবা-মায়ের ঘরে, আমার পাশে কাকা নাই। আমিতো চিৎকার! আমি কাকার কাছে যাব! কাকার কাছে যাব! মা কত বোঝায়, আমি শুনতেই চাই না, চিৎকার করছি আর বলছি, আমি কাকার কাছে যাব! কাকা আমার চিৎকার শুনে বাসর ঘর খুলে এসে বলে, কি হয়েছে? বাবু কাঁদছে কেন? আমি বললাম, আমি তোমার কাছে ঘুমাবো। আমার মা কত কিছু বোঝানোর চেষ্টা করল। আমি কিছুতেই রাজি না। আমি কাকার কাছে ঘুমাবো। কাকা বলেন, ঠিক আছে। মা বলল, কি ঠিক আছে? তুমি যাও তোমার বউ একা ঘরে বসে আছে, আমি দেখছি ওকে। কাকা বলল, ভাবী, আমারও তো ওকে ছাড়া ঘুম আসবে না।

আমাকে নিয়ে গেল বাসর ঘরে। নিয়ে চাচীকে বলল, শাহানা শোন, এরা দুই ভাই-বোন আমার কলিজার টুকরা, আমি এদেরকে কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছি, তুমি এদের অবহেলা করবে না। এভাবে তিন দিন পার হয়ে গেল। তাদের মধ্যে কি যে হল জানি না।

কাকা চাচী কে নিয়ে শ্বশুড় বাড়ী গেলেন, ওখানে তিনদিন থাকলেন। তারপর চলে আসার সময় চাচী আর আসল না। কেন আসে নাই, কি জন্যে আসে নাই চাচী, তখন বুঝতে পারি নি। যখন বড় হলাম তখন মায়ের কাছ থেকে জানতে পারি আমার চাচী কাকাকে বলেছিলেন, যদি তুমি ওই দুই ছেলে-মেয়েকে ছেড়ে আমার কাছে থাকতে পার তবেই তোমার সাথে সংসার করবো, না হয় করবো না। কাকা বলেছিলেন, না, আমি ওদেরকে ছাড়তে পারব না। তারপর থেকেই কাকা বাকী জীবনটা একাই কাটিয়েছেন।

কাকার চিন্তাই ছিল আমরা দুই ভাই-বোন, গরীব-দুঃখীর সেবা, আর মসজিদ পরিচালনা করা। এভাবেই দিন কাটত তার। আমার কাকা বাজারে প্রথম যে জিনিসটা উঠতো সেটাই আমাদের জন্য কিনে নিয়ে আসতেন। আমাদের দুই ভাই-বোনের কোন চাওয়াই অপূর্ণ রাখেন নি। আমাদের লেখা পড়ার সমস্ত খরচ দিতেন তিনি। আমাদের যতো আবদার পূরণ করতেন তিনি।

আমার মনে আছে, কোন এক ঈদে আমি তখন ছোট, কার কাছে যেন একটা খেলনা পিস্তল দেখেছিলাম, ওই পিস্তলটাই আমাকে কিনে দিতে হবে, তাই কি যে কান্না। তখন রাত অনেক, দোকান বন্ধ। কাকা মটর সাইকেল নিয়ে দোকানদারকে বাসা থেকে নিয়ে এসে পিস্তল কিনে আনেন, তারপর আমি শান্ত হই।

আমার কাকা প্রথম যখন স্ট্রোক করে তখন আমি ৯ম শ্রেণীতে পড়ি। যশোরে একটা হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়। আমি কোনোভাবেই তার কাছ থেকে সরিনি। সারা রাত জেগে থাকতাম, আর কি লাগবে এটা জানার জন্য। ১০ দিন থেকে তাকে সুস্থ করে বাসায় নিয়ে যাই।

আমি যখন যশোর থেকে ঢাকায় আসতাম কাকা কমপক্ষে ৭/৮ বার ফোন দিত আর বলত, আব্বা তুমি এখন কোথায়, কোন অসুবিধা হচ্ছে না। আমি বিরক্ত হয়ে বলতাম তুমি আর ফোন দিবা না। আমি বাসা পৌছে তোমাকে ফোন দেব। দিনে ৩/৪ বার ফোন দিত আব্বা তুমি খেয়েছ? আব্বা শরীর ভাল আছে তো। আব্বা কোন অসুবিধা হচ্ছে? আমি ঢাকা এক মাসের বেশি থাকতে পারতাম না। মাস শেষ হওয়ার আগেই বাড়ী চলে যেতাম। রাতে গেলে আমার কাকা জেগে থাকত ভোরে পৌছাতাম তখন জড়িয়ে ধরত। একটুও বিরক্ত হত না।

আমি যখন যশোর কারাগারে বন্দী। তখন তিনি সবাইকে অনুরোধ করতেন, যেন তাকে আমাকে দেখতে নিয়ে যায়। কিন্তু তার শরীর খারাপ থাকায় কেউ তাকে নিয়ে যেত না। সবাই ভাবত যদি ওখানে আমার কষ্ট দেখে সে সহ্য করতে না পেরে আবার যদি অসুস্থ হয়ে যায়। কিন্তু একদিন কাউকে কিছু না বলে বাড়ী থেকে একাই বাসে উঠে চলে আসে, আমাকে দেখার জন্য।

আমি তো তাকে দেখে অবাক, যে মানুষ কারো সাহায্য ছাড়া হাঁটতে পারে না যে কিভাবে আসল। আমাকে বলছে, ওরা আমাকে তোমার কাছে আনে না। তাই আমি চুরি করে চলে এসেছি আব্বা। আমি কান্না সামলে নিয়ে বললাম তুমি কাজটা ঠিক করনি। কী করব, তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল। আর বলছিল বাবু তুমি কোন দোষ করনি আল্লাহ তোমার সাথেই আছে। আমি আমার বাবু কে মানুষের মত মানুষ করেছি। তাই এত বাধা তোমার জীবনে। তুমি ভয় পেয় না, সত্যের জয় একদিন হবেই। আল্লাহর উপর ভরসা রেখো।

কাকা কিভাবে যেন জেনে গেছে আম্মা অসুস্থ আর আমি এ্যাকসিডেন্ট করে একি হাসপাতালে ভর্তি। সম্ভবত এটা নিয়ে খুব দুঃশ্চিন্তা করছিল। আসরের নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় স্ট্রোক করে সিঁড়ি থেকে পরে যায়। বাসায় তখন কেউ নেই। পরে বাড়ির বাইরে থেকে মহিলারা দৌড়ে এসে ধরে উঠায়। আব্বা সদ্য বাইপাসের রোগী, কি করবে বুঝতে পারছে না।

কাকাকে গাড়িতে করে যশোর কুইন্স হাসপাতালে নেয়া হয়, সেখানে বলে কার্ডিওলোলজি সব থেকে ভাল চিকিৎসা হয় যশোর সদর হাসপাতালে, সেখানে নিয়ে যান আমার বাবা। বাবা অসুস্থ থাকায় তার নামই ঠিক মত লেখাতে পারেন না। হাসপাতালে চিকিৎসার অনেক সু-ব্যবস্থা আছে। ওখানে সিসিইউ ও আইসিইউ আছে, কিন্তু সুপারিশ ছাড়া কার্ডিওলজি বিভাগে রোগী ভর্তি করা খুবই কঠিন।

আমি ওই রাতে কত মানুষে ফোন করেছি, আমার কাকাকে বাঁচান, আপনারা বললেই তাকে কার্ডিওলোজি বিভাগে ভর্তি নিবে, কেউ শোনে নাই আমার কথা, এড়িয়ে গেছে সবাই। যে ডাক্তার সারাজীবন গরীব মানুষে ফ্রি চিকিৎসা করেছেন, সেই মানুষটির চিকিৎসা হবে না তাকে স্যালাইন দিয়ে জরুরী বিভাগের ফ্লোরে শুইয়ে রাখা হয়েছিল। কাছে একটা আপন মানুষ নাই। একজন কাজের মেয়ে ছাড়া।

রাত অনেক হয়েছে, আমাকে সবাই ঘুমাতে বলছিল, আমি কিভাবে খাটে শুয়ে ঘুমাবো, যে আমাকে মানুষ করেছে, বুকের উপরে রেখে ঘুম পাড়িয়েছে, সেই মানুষটি আজ ফ্লোরে শোয়া, আমি কি করে নরম বিছানায় শোব। আমি সারারাত না শুয়ে বসে থাকলাম। রাত ২ টার দিকে বাবাকে ফোন দিলাম; বললাম, আব্বা খবর কি? আব্বা বলল, ঘুমাচ্ছে। রাত ৩ টায় আব্বার ফোন আসল। ফোনের রিংটা শুনেই যেন আমার মনের ভিতরে কেমন করে উঠল। আব্বা বলল, ডাক্তার আর নাই। আমি নিজেকে সামলে আব্বাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম। বাবা বলল, বাবু তুমি কি ঠিক আছ? আমি আর কথা বলতে পারলাম না। কাকা আর নাই কত বড় সত্য।

কাকা জানো, এই সমাজ টা যেন কেমন; কাউকে দিয়ে একটা ফোন করাতে পারিনি বলে বিনা চিকিৎসায় তোমাকে চলে যেতে হল। এই ব্যর্থতা কার, আমি নাকি মানি এই সমাজ! জানো কাকা, এখন আর কেউ ফোন করে বলে না, বাবু ....... খেয়েছ আব্বা! কেউ বলে না তুমি বাসায় পৌঁছেছ সোনা; বলে না, বাবু তোমার কিছু লাগবে।

কাকা তুমি চলে যাওয়ার পর আমি বুঝতে পেরেছি পৃথিবীতা অনেক কঠিন জায়গা। আমি জানিনা পৃথিবীতে এমন কোন পিতা আছে কিনা যে জন্ম না দিয়েও পিতার সমস্ত দায়িত্ব পালন করেছে।

কাকা তুমি জন্মদাতা নাহলেও তুমি আমার পিতা। তোমাকে হারিয়ে আমি এতিম হয়ে গেছি। জীবনে প্রতিটা ক্ষেত্রের আমি তোমাকে অনুভব করি। আমি তোমার মত হতে চাই কাকা।

কাকা যা দিয়ে গেছে, তার ঋণ এর বোঝায় আমি জর্জড়িত। তোমার নীতি-আদর্শের নিয়েই আমি বাকি জীবটা কাটাতে চাই।

পাঠক মন্তব্য () টি

বিনিয়োগের ধারণায় চীনের নতুন চমক

কোন বিরতি ছাড়াই পাঁচ বছর নেপালে ‘বোধিছায়া’ নামের নাটকটির মঞ্চায়ন হবে।

কেন হানাফী মাজহাবের অনুসারী হলাম

চার ইমামের কারো যোগ্যতা কি ইমাম আলবানীর চেয়ে কম ছিল?

রোহিঙ্গাদের জাতিগত নির্মূলে সহযোগী সেই রেনেটা

খুনীদের পৃষ্ঠপোষক কিভাবে জাতিসংঘের মত প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে!

কপিরাইট ২০১৪ onlineBangla.com.bd
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: গুলবুদ্দিন গালীব ইহসান
অনলাইন বাংলা, ৬৯/জি গ্রিন রোড, পান্থপথ (নীচ তলা), ঢাকা-১২০৫।
ফোন: ৯৬৪১১৯৫, মোবাইল: ০১৯১৩৭৮৯৮৯৯
ইমেইল: contact.onlinebangla@gmail.com
Developed By: Uranus BD