সর্বশেষ আপডেট ৩৯ মিনিট আগে
আপনি আছেন হোম / ফিচার / ইতিহাস / শোকাবহ আশুরার বিবরণ

শোকাবহ আশুরার বিবরণ

প্রকাশিত: ১২ অক্টোবর ২০১৬ ১২:৪৫ টা | আপডেট: ১২ অক্টোবর ২০১৬ ১৬:১৯ টা

ফিচার ডেস্ক, অনলাইন বাংলাঃ

আজ ১০ মহররম, পবিত্র আশুরা। ৬১ হিজরি সনের মহররমের ১০ তারিখে ফোরাত নদীতীরের কারবালা প্রান্তরে শাহাদাতবরণ করেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় নাতি এবং হযরত আলী (রা.) ও হযরত ফাতেমার (রা.) ছেলে হযরত হোসেন (রা.)। আরবিতে আশুরা অর্থ ১০। শোকের এ দিনটি তাই ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কাছে 'আশুরা' নামে পরিচিত।

ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলীর (রা.) ইন্তেকালের তার জ্যেষ্ঠ পুত্র হযরত হাসান (রা.) সর্বসম্মতিক্রমে ইসলামের খলিফা নিযুক্ত হন। কিন্তু বিদ্রোহী মুয়াবিয়া (রা.) নিজেকে খলিফা হিসাবে ঘোষণা করেন।

সমগ্র মুসলিম জাহানে এই ইসলাম-বিরোধী এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। কিন্তু মুসলমানদের পরষ্পরদের মধ্যে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় ঐক্য ও বৃহত্তর স্বার্থে হাসান (রা.) খলিফার পদ ছেড়ে দিয়ে মোয়াবিয়ার (রা.) সন্ধি চুক্তি করেন। এ চুক্তি অনুযায়ী মুয়াবিয়ার পরে পর হাসানের ছোট ভাই হযরত হোসেন (রা.) খলিফা নিযুক্ত হবেন।

কিন্তু সম্পাদিত চুক্তি বরখেলাপ ও ওয়াদা ভঙ্গ করে মোয়াবিয়া তার ছেলে এজিদকে খলিফা নিয়োগ করেন। ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে মুয়াবিয়া ইন্তেকাল করেন। এরপর এজিদ তার আনুগত্য নির্দেশ দিয়ে ওয়ালিদ ইবনে উত্বার মারফত হযরত হোসেনের (রা.) লিখিত ফরমান পাাঠান।

ইসলামের বিধঘান অনুযায়ী বংশানুক্রমিক শাসন বা রাজতন্ত্র নিষিদ্ধ। তাই এজিদের কাছে বায়াত নিতে অস্বীকৃতি জানান হযরত হোসেন (রা.)। প্রতিবাদে তিনি মদিনা ছেড়ে মক্কায় চলে যান। পরে মক্কা, মদিনাসহ অন্যান্য নগরীগুলোতে হযরত হোসেনকে বৈধ খলিফা দাবি করে এজিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হয়।

এক পর্যায়ে কুফাবাসী হযরত হোসেনকে বায়াত গ্রহণের আহ্বান জানালে তিনি চাচাতো ভাই হযরত মুসলিম বিন আকিলকে (রা.) কুফায় পাঠান। কুফাবাসী দলে দলে মুসলিমের কাছে হোসেনের নামে বায়াত গ্রহণ করেন। তার পক্ষ থেকে হোসনকেও কুফায় যাওয়ার জন্য বার্তা পাঠানো হয়। কিন্তু এরমধ্যেই এজিদের অনুগত ইরাকের শাসনকর্তা জিয়াদ হযরত মুসলিমকে (রা.) হত্যা করে।

পরে হযরত হোসেন পরিবারের সদস্য, স্বজনসহ বাহাত্তরজন সঙ্গী নিয়ে কুফার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। পথে মুসলিমের (রা.) শাহাদাতের  সংবাদ পায় হোসেনের কাফেলা। ততক্ষণে তারা কারবালায় ফোরাত নদীর তীরে উপস্থিত হয়েছেন।

সেখানে প্রথমে এজিদের অনুগত ওমর উবনে সাদের নেতৃত্বাধীন চার হাজার সেনা তাদের বাধা দেয়। পরে আরেক এজিদ সেনা ওবায়দুল্লাহ নেতৃত্বে আরও ১৮ হাজার এজিদ সেনা হোসেনের কাফেলাকে অবরোধ করে।

২২ হাজার এজিদ বাহিনী হোসেনকে (রা.) বিনাশর্তে আত্মসমর্পণ, এজিদের প্রতি বায়াত গ্রহণের নির্দেশ দেয়। কিন্তু অবৈধ ও স্বৈরাচারী খলিফা এজিদের অনুগতদের নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করেন।

তখন আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে হোসেনের কাফেলাকে পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। ফলে নারী-শিশুসহ সবাই তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়েন। কিন্তু হোসেন আত্মসমর্পণ না করার ব্যাপারে অবিচল থাকেন।

১০ মহররম এজিদের বাহিনীর অবরোধের বিরুদ্ধে জিহাদ শুরু করেন হোসেন (রা.)। অসম এ যুদ্ধে ইমাম হুসাইনসহ (রা.) ও ১৩০ জন শাহাদাতবরণ করেন। ওই দিনটি ছিল রোজ শুক্রবার। শাহাদাতের সময় তার বয়স হয়েছিল ৫৪ বছর ছয় মাস ১৫ দিন।

শাহাদাতের আগে হযরত হোসেনের শরীরে (রা.) ৩৩টি বর্শার এবং তলোয়ারের ৩৪টি আঘাত করা হয়। শিমার ইবন যিল জাওশার নির্দেশে যোরআ ইবন শরীক তামীমী হোসেনের কাঁধে তলোয়ার দিয়ে কোপ দেয়। পরে মাথা কেটে নেয়।

কারবালায় হোসেনের সঙ্গে নিহত ১৩০ জনের মধ্যে ১৭জন ছিলেন নবীজীর বংশ বনু হাশিম গোত্রের সন্তান।

এদিকে ১১ মহররম হযরত হোসেনের পরিবারের জীবিত নারী ও শিশুদেরকে হাতে-পায়ে শেকল পরিয়ে উটে চড়িয়ে কুফায় নিয়ে যাওয়া হয়। হোসেনের কর্তিত মস্তক কুফায় নিয়ে যায় ‘হাওয়া বিন ইয়াযীদ’।

পরদিন সকালে কুফার শাসক ইবনে যিয়াদের দরবারে একটা পাত্রের উপর রেখে হযরত হোসেনের মস্তক হাজির করা হয়। সেখানে পাপিষ্ঠ ইবনে যিয়াদ নবীজীর নাতির মস্তকেরও অবমাননা করেন।

সেখানে অসুস্থ অবস্থায় বন্দি হযরত হোসেনের ছেলে জয়নুল আবেদদীনকে হত্যা করার নির্দেশ দেন ইব্নে জিয়াদ। এ সময় হোসেনের বোন জয়নাব (রা.) প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তিনি বলেন, ওহে জালিমেরা! আমাদের সাথে কোন পুরুষ মাহরাম (আপনজন) নেই। এ একমাত্র আমাদের মাহরাম। যদি তোমরা একেও কতল করো, আমাদের সাথে কোন মাহরাম থাকবে না। তাই আমাকে কতল না করে এর কাছে পৌঁছতে পারবে না। যদি একে কতল করতে চাও তাহলে প্রথমে আমাকে কতল করো।

জয়নাবের হুঁশিয়ারি শুনে পাপিষ্ঠ ইব্নে জিয়াদ ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লে হযরত জয়নুল রেহাই পান।
 
পরে হযরত হোসেনের সমর্থক কুফাবাসীদের ভয় দেখানরো জন্য হযরত হোসেনের মস্তক এবং তার পরিবারের বন্দি সদস্যদের সেখানকার রাজপথে তিনদিন ধরে ঘোরানো হয়।

পরে তাদের রাজধানী দামেস্কে এজিদের দরবারে নিয়ে যাওয়া হয়। এজিদ প্রথমে নবীজীর (সা.) পরিবারের বন্দিদের সঙ্গে রুক্ষ আচরণ করে অহঙ্কার প্রকাশের চেষ্টা করেন। কিন্তু হযরত জয়নাব কঠোর ভাষায় তাকে তিরস্কার করেন।

এরপর এজিদের দরবারে যখন হযরত হোসেনের মস্তক হাজির করা হয়, তখন অবৈধ এ খলিফা লজ্জিত হয়ে যান। ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে তিনি কুফার শাসক ইবন যিয়াদকে অভিশাপ দেন। তবে এজিদ তাকে বরখাস্ত ও হত্যা করেননি। বরং কারবালার মতো মদীনায়ও এজিদের নির্দেশে রক্ত নদী বইয়ে দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে এজিদের নির্দেশে শহীদ হোসেন পরিবারকে দামেস্ক থেকে মদীনায় পাঠান হয়।পথে শাহাদাতের ৪০তম দিনে তারা কারবালা প্রান্তরে পৌঁছান। ওই রাত সেখানে অবস্থান করে নবীর পরিবার সারা রাত কোরআন তেলাওয়াত করেন, দুয়া-দুরূদ শরীফ পাঠ করেন এবং খিচুড়ি খান।

পরদিন তারা মদিনার পথে রওয়ানা দেন। তাদের আগমনের খবর বিদ্যুৎ গতিতে সমগ্র মদিনায় ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিটি ঘরের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা প্রত্যেকেই মজলুম কাফেলাকে এক নজর দেখার জন্য ঘর থেকে বের হয়ে আসেন।

মদীনায় পৌঁছে হযরত জয়নুল আবেদীন নবীজীর (সা.) রওজা মোবারক জিয়ারত করেন। মদীনায় নবী পরিবার অনেকটা কাকী থাকতে পছন্দ করতেন। সাধারণ লোকদের সাথে মেলামেশা করতেন না।

এরমধ্যে জয়নুল আবেদীনের মাধ্যমে নবীজীর (সা.) রক্তের ধারা জারি ছিল। তিনি পানি দেখলে কান্নাকাটি করতেন। বলতেন, এই সেই পানি, যা আলী আছগরের ভাগ্যে জোটেনি, আলী আকবরের ভাগ্যে জোটেনি, আহলে বাইতের সদস্যদের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল।

তিনি সামান্য খাবার খেতেন। সবসময় একাকী থাকতে পছন্দ করতেন। লোকদের সঙ্গে তেমন মেলামেশা করতেন না। আমৃত্যু তিনি আর হাসেননি।

হযরত জয়নুলের কাছে তার ছেলে হযরত মুহম্মদ বাকির (রহ.)  জানতে চেয়েছিলেন তিনি কেন কোনো দিন হাসেন না।

জবাবে জয়নুল আবেদীন বলেন, হে পুত্র! আমার চোখের সামনে কারবালার যে দৃশ্য ফুটে রয়েছে, তা দেখলে তোমার মুখ থেকেও চিরদিনের জন্য হাসি বন্ধ হয়ে যেত! তুমিও সারা জীবনে কোনদিন হাসতে না। বৎস! আমি নবীজীর (সা.) দেহ মুবারকের নকশার মতো দেখতে হযরত হোসেনের দেহ মুবারককে মাটিতে গড়াগড়ি খেতে দেখেছি। আমি নবীজীর (সা.) প্রিয় নাতিকে আঘাতে জর্জরিত হয়ে কারবালার তপ্ত বালি-রাশির উপর দাফন-কাফনবিহীন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছি।

পাঠক মন্তব্য () টি

জাফনা হাসপাতাল হত্যাযজ্ঞের ২৯ বছর

শ্রীলংকার জাফনা দ্বীপের জাফনা হাসপাতালে চালানো কুখ্যাত হত্যাযজ্ঞের ২৯তম বার্ষিকী আজ ২১…

আল্লাহ একমাত্র প্রভু, মুহাম্মদ (সা.) তার নবী: গাদ্দাফী

অসিয়তনামায় গাদ্দাফী তার বিশ্বাস সম্পর্কে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, আল্লাহ একমাত্র প্রভু, মুহাম্মদ…

‘কতলে হুসেন মরগে ইয়াজিদ হ্যায়’

জনসম্মতিহীন দখলদার শাসকের বিরুদ্ধে জীবনবাজী রেখে প্রতিবাদ করাই আশুরার শিক্ষা।

কপিরাইট ২০১৪ onlineBangla.com.bd
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: গুলবুদ্দিন গালীব ইহসান
অনলাইন বাংলা, ৬৯/জি গ্রিন রোড, পান্থপথ (নীচ তলা), ঢাকা-১২০৫।
ফোন: ৯৬৪১১৯৫, মোবাইল: ০১৯১৩৭৮৯৮৯৯
ইমেইল: contact.onlinebangla@gmail.com
Developed By: Uranus BD